দানবীর হাজি মুহাম্মদ মহসিনঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
হাজি মুহাম্মদ মহসিন ১৭৩২ সালে পশ্চিম বঙ্গের হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন, তার বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ ও মা জয়নাব খানম। ফয়জুল্লাহ ছিলেন একজন ধনী জায়গিরদার। তাঁর পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস ছিল সুদূর ইরানের পারস্যে। সেখান থেকে ভাগ্য অন্বেষণে এসেছিলেন ভারত বর্ষে। তারপর স্থায়ীভাবে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি শহরে বসবাস শুরু করেন। জয়নব খানম ফয়জুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী। জয়নবেরও পূর্বে বিয়ে হয়েছিল। মন্নুজান খানম নামে তার ঘরে সাবেক স্বামী আগা মোতাহারের একটি মেয়ে ছিল। আগা মোতাহার বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন। হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় তার জায়গির ছিল। আগা মোতাহারের সম্পত্তি তার মেয়ে মন্নুজান উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছিলেন।
গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে মহসিন ও তার সৎ বোন মন্নুজান শিক্ষার্জন করেছেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজধানী মুর্শিদাবাদে যান। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দেশভ্রমণের সফরে বের হন। সফরকালে তিনি হজ পালন করেন এবং মক্কা, মদিনা, কুফা, কারবালাসহ ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক এমন নানা স্থান সফর করেছেন।
১৮০৩ সালে মন্নুজানের মৃত্যুর মহসিন তার উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পদের মালিক হন। মহসিন খুব ধার্মিক ছিলেন এবং সহজসরল জীবনযাপন করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন চিরকুমার। তার বিপুল সম্পদ দান সদকায় ব্যয় করতেন। ১৭৬৯-৭০ সালের সরকারি দলিল অনুযায়ী তৎকালীন দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেক লঙ্গরখানা স্থাপন করেন এবং সরকারি তহবিলে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন।১৮০৬ সালে তিনি মহসিন ফান্ড নামক তহবিল প্রতিষ্ঠা করে তাতে দুইজন মোতাওয়াল্লি নিয়োগ করেন।ব্যয়নির্বাহের জন্য সম্পত্তিকে নয়ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ভাগ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, চারটি ভাগ পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কর্মকাণ্ড এবং দুইটি ভাগ মোতাওয়াল্লিদের পারিশ্রমিকের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
হাজি মুহাম্মদ মহসিন ১৮১২ সালে হুগলিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে হুগলি ইমামবাড়ায় দাফন করা হয়।
দানশীলতার কারণে তিনি কিংবদন্তীতে পরিণত হন এবং বর্তমানেও দানের ক্ষেত্রে তুলনা অর্থে তার দৃষ্টান্ত ব্যবহার হয়ে থাকে। পাঠকদের জন্য এই মহান ব্যক্তির কর্মময় জীবনের বিস্তারিত তুলেধরা হলো-
দানবীর হাজি মুহাম্মদ মহসিনের অবদান বাংলার ইতিহাসে অনস্বীকার্য। তিনি শুধু দানবীরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের প্রতি মায়া-মমতার মূর্ত প্রতীক। মুসলমান জনগোষ্ঠীকে উচ্চ শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ১৮০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘মহসিন ফান্ড’ নামক সংস্থায় গঠন করে তাঁর সর্বস্ব দান করেছিলেন। দান ও মহানুভবতার জন্য তার অবদান মানব ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
হাজি মুহাম্মদ মহসিনের মা জয়নব খানম ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের খাজাঞ্চি আগা মোতাহারের দ্বিতীয় স্ত্রী। ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতবর্ষে আসা আগা মোতাহার সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান ছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর ঘরে কোনো সন্তান না হওয়ায় তিনি জয়নব খানমকে সন্তান লাভের আশায় বিবাহ করেন। দীর্ঘ দিন পর মোতাহারের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নিল কন্যা সন্তান মন্নুজান। আগা মোতাহার এক সময় তাঁর মেয়ের নামে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দান করেন। মন্নুজান ছোট থাকায় এ দানপত্র তিনি একটি মাদুলিতে ভরে তাঁর গলায় পরিয়ে দেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তা দেখার জন্য উপদেশ দেন।
আগা মোতাহারের মৃত্যুর পর মন্নুজান সবে মাত্র কৈশোরে পদার্পন করেছে। সে মাদুলি খুলে দেখেন আগা মোতাহার তার সমস্ত সম্পদ মেয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন। যা দেখে জয়নব খান মন্নুজানকে হাতছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না। পরে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেন আগ মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহকে। এ ঘরেই জন্ম গ্রহণ করেন দানবীর হাজি মুহাম্মদ মহসিন। তখন সৎ বোন মন্নুজানের বয়স ১৩ বছর। মন্নুজানও ভাই পেয়ে মহাখুশী। হাজি মুহাম্মদ মহসিনের লালন–পালন, দেখাশুনা ও বাল্য শিক্ষা মন্নুজানের তত্ত্বাবধানেই চলতে লাগলো।
স্থানীয় মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন হাজি মুহাম্মদ মহসিন। সেখানে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষা শিখতেন। অল্প বয়সে তাঁর মেধা ও মনের গভীরতার পরিচয় পেয়ে শিক্ষকগণ অবাক হয়ে যান। চারিদিকে তার অসাধারণ মেধার কথা ছড়িয়ে পড়ে। পরে মুর্শিদাবাদের নবাব তাঁর মেধা কথা জানতে পেরে তাঁকে ডেকে পাঠান উচ্চ সরকারি পদ গ্রহণ করার জন্য। ইতোমধ্যে তাঁর পিতা মারা যান।
এদিকে বড়বোন মন্নুজান যৌবনে পদার্পন করেন। হাজি মুহাম্মদ মহসিন শিক্ষাকালে মন্নুজান হুগলিতে একাকি বাড়িতে থাকতেন। একদিকে তাঁর অনেক সম্পদ অন্য দিকে যুবতী মেয়ে। তাই কিছু দুষ্ট লোক তাঁর পেছনে ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। মন্নুজান ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ভাই হাজি মুহাম্মদ মহসিনকে পত্র পাঠান। পত্র পেয়ে হাজি মুহাম্মদ মহসিন বোনকে রক্ষায় বাড়ি ফিরে আসেন। ভাই মহসিনকে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। এবং
বোনকে সুপাত্রস্থ করার জন্য মহসিন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অবশেষে হুগলিতে নবাবের নিযুক্ত ফৌজদার সালাহউদ্দিনের সঙ্গে বোনের বিবাহ দিলেন। ধন–সম্পদের প্রতি নিরাসক্ত হাজি মুহাম্মদ মহসিন বোনের বিয়ের পর দেশ ভ্রমণে বের হন।
সফরকালে পবিত্র হজ পালন করে মক্কা,মদিনা, কুফা, কারবালাসহ ইরান, ইরাক,আরব, তুরস্ক এমন নানা স্থান সফর করে দীর্ঘ ২৭ বছর পর দেশে ফিরে আসেন। তখন তাঁর বয়স ৬০ বছর। এদিকে নিঃসন্তান বোন মন্নুজান স্বামীকে হারিয়ে বিধবা। তিনিও বার্ধক্যে উপনীত। অন্যদিকে বিশাল সম্পদের মালিক আবার একাকি নিঃসঙ্গ। বোন মন্নুজান সম্পদের পেরেশানি থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ধ্যানে জীবন কাটাতে ছোট ভাইয়ের নামে তাঁর সমস্ত সম্পদ লিখে দেন। সম্পদ লিখে দেয়া কয়েক বছর পর ১৮০৩ সালে মন্নুজান ইন্তেকাল করেন। হাজি মুহাম্মদ মহসিন ছিলেন ধার্মিক, দয়ালু এবং দানবীর, তিনি সহজ সরল জীবনযাপন করতে পছন্দ করতেন। ৭০ বছরের হাজি মহসিন এ বিপুল সম্পদ দান সদকায় ব্যয় করার মনস্থ করলেন এবং বিশাল সম্পদ মানবতার কল্যাণে ব্যয় করেন। দেশের সকল গরীব–দুঃখী ও দুঃস্থদের সেবায় তিনি নিজের সব সম্পদ বিলিয়ে দেন। ১৮০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘মহসিন ফান্ড’ নামক তহবিল প্রতিষ্ঠা করে তাঁর সমুদয় অর্থ এ ফাউন্ডেশনের জন্য দান করেন। এ ফান্ডের কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য দু'জন মোতাওয়াল্লি নিয়োগ করেন। শুধু মোতাওয়াল্লি নিয়োগই নয়, মহসিন ফান্ডের ব্যয় নির্বাহের জন্য দানকৃত সম্পত্তিকে নয়ভাগে ভাগ করেন।
তন্মধ্যে তিনভাগ সম্পদ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য। চারভাগ সম্পদ পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে খরচ করার জন্য এবং দুইভাগ সম্পদ মোতাওয়াল্লিদের পারিশ্রমিকের জন্য বরাদ্দ করেন। তাছাড়া তাঁর দানকৃত অর্থে অসংখ্য দারিদ্র্য ছাত্রের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়।
১৮০৬ সালে তিনি তাঁর প্রায় সমস্ত ভূ–সম্পত্তি একটি ওয়াকফ দলিলের মাধ্যমে দান করে যান। তাঁর মৃত্যুর পরে সেই সম্পত্তির পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে আদালতের মাধ্যমে আইনি ঝামেলা মিটিয়ে সরকার মহসিন ট্রাস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৮৩৫ সালেই এই ট্রাস্টের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলী মহসিন কলেজ এবং এই কলেজের সাথে হাজী মুহসীনের অর্থে পূর্বে নির্মিত দুটি স্কুলকে মিলিয়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য এইটিই ভারতবর্ষের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কলেজ যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যেকেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। এর আগে ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ ছিল শুধু ‘the sons of respectable Hindoos’ এর জন্য এবং ১৮১৮ ও ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ ও বিশপস কলেজ ছিল খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অক্ষয় চন্দ্র সরকার, স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী,শরৎচন্দ্র টট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ভুবনবিশ্রুত বাঙ্গালিরা সবাই এই হুগলী মহসিন কলেজের ছাত্র ছিলেন। অবশ্য ১৮৩৫ সালে ইংরেজ সরকার এর নাম হুগলী মহসিন কলেজ রাখলেও কোন এক কারণে দিনে দিনে মানুষের বলায় ও লেখায় এর নামটি দাঁড়ায় শুধু হুগলী কলেজ। মুহসীন শব্দটি ঝরে পড়ে যায়। ১৮৬০ সালের পরে কোনো কাগজপত্রে কিংবা সাইনবোর্ডে আর মুহসীন নামটা দেখাই যায় না। ১৯৩৬ সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় কলেজটি মূল নামে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সে দাবি অনুযায়ী সরকারিভাবে পুনরায় কলেজটির নাম হয় হুগলি মহসিন কলেজ।
মহসিন ট্রাস্ট তথা মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর সৃষ্টি শুধু হুগলি মহসিন কলেজ নয়। হুগলিতে একটি হাসপাতাল নিয়মিতভাবে এই অর্থে চলছে। মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অধিকাংশ জমি ছিল যশোর ও খুলনায়। এই ট্রাস্ট এস্টেটের জমিতে অনেকগুলো দাতব্য হাসপাতাল, সরকারি অফিস, খুলনা–কলকাতা রেললাইন ছাড়াও গড়ে ওঠে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খুলনার দৌলতপুরের সরকারি ব্রজলাল কলেজের ৪২ একর জমির ৪০ একরই মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের জমি। ব্রজলাল কলেজের অনেক আগে ১৮৬৭ সালে মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর অর্থে দৌলতপুরে তৈরি হয় একটি এ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুল। ১৯৩৯ সালে এর নামকরণ হয় দৌলতপুর মহসিন হাই ইংলিশ স্কুল। ১৮৮৬ সালে সরকারি অর্থে খুলনা জেলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কিছুদিনেই স্কুলটি অর্থাভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে সরকারি সেই স্কুলটির জন্যও সরকার মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট থেকে অর্থ মঞ্জুর করেন। এছাড়াও মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অর্থে খুলনার দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মহসিন বালিকা বিদ্যালয় ও মহসিন মহিলা কলেজ।
১৮৭৪ সালে মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর অর্থে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার মাদ্রাসাটি এখন সরকারি কবি নজরুল কলেজ ও চট্টগ্রামের মাদ্রাসাটি এখন হাজি মহম্মদ মহসিন কলেজ। আর রাজশাহীরটি এখন রাজশাহী গভর্নমেন্ট মাদ্রাসা নামে রাজশাহী বোর্ডের অধীনে ইসলামি শিক্ষা শাখায় আই এ সার্টিফিকেট প্রদানের প্রতিষ্ঠান রূপে চলছে।
নবাব আব্দুল লতিফ, নবাব খাজা আব্দুল গণি প্রমুখের আবেদন নিবেদনের ভিত্তিতে ১৮৭৩ সালে সরকার মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ডের অর্থে স্কলারশিপ মঞ্জুরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকার আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে-যশোর, রংপুর,পাবনা, ফরিদপুর, বাকরগঞ্জ, ময়মনসিংহ,নোয়াখালি ও সিলেট জেলার স্কুলগুলোতে মুসলিম ছাত্রদের দুই তৃতীয়াংশ বেতন ও একজন আরবি শিক্ষকের বেতন এই ফান্ড খেকে দেয়া হবে। ১৯৩১ সালে বেঙ্গল এডুকেশন কোড মহসিন ফান্ডের বৃত্তির পরিমাণ ও সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে দেয়।
ধন–সম্পদের প্রতি নির্লোভ বাংলার শ্রেষ্ঠ দানবীর হাজি মুহাম্মদ মহসিন ১৮১২ সালে ৭৯ মতান্তরে ৮০ বছর বয়সে হুগলির নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। তাকে হুগলির ইমামবাড়ায় দাফন করা হয়।
এ মহান দানবীর তাঁর অসামান্য দানের কারণে কিংবদন্তীতে পরিণত হন। তাঁর স্মরণে হুগলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলি কলেজ। বাংলাদেশের ‘চট্টগ্রাম সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ’ প্রতিষ্ঠা হয় তাঁর ওয়াকফকৃত অর্থ থেকে প্রাপ্ত অনুদানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মহসিন হল’ এবং ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি ‘বিএনএস হাজি মহসিন’ও তাঁর স্মরণে নামকরণ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে যেকজন দানবীর মহামানবের নাম আসবে, তাদের মধ্যে বাংলার মহান দানবীর ও মুসলিম শিক্ষাজাগরনের অগ্রদূত হাজি মুহাম্মদ মহসীন অন্যতম একজন। তিনি ছিলেন, ব্যক্তিজীবনে ধর্মপরায়ন এবং সামাজিক জীবনে দানবীর ও শিক্ষানুরাগী। বাংলা তথা ভারত বর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থায় হাজি মুহাম্মদ মহসীনের অবদান অতুলনীয় ও অনস্বীকার্য।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। mohsinbhuiyan1980@gmail.com
01712-643172
Friday, May 17, 2019
বিশ্ব নবীর বিদায় হজ্জের ভাষণঃ (মুহাম্মাদ মহসীনভূঁইয়া)
বিশ্ব নবীর বিদায় হজ্জের ভাষণঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
নবী মুহাম্মদ (সঃ) আরাফাত ময়দানে ১০ যিলহজ্জ তারিখ কাসওয়া উটনীর পিঠে আসন গ্রহণ করেন, সে সময় প্রায় এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার সাহাবী তাঁর চারদিকে সমবেত ছিল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে মানবতার মহান মানব, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) বলেন-
হে লোক সকল, আমার কথা শোনো, আমি জানিনা, এবারের পর আমি তোমাদের সাথে এই জায়গায় আর মিলিত হতে পারবো কিনা।
তোমাদের রক্ত ও ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্য আজকের দিন, বর্তমান মাস এবং এই শহরের মতই নিষিদ্ধ। শোনো মানুষ সকল, জাহেলিয়াত যুগের সবকিছু আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহেলিয়াতের খুনও খতম করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যকার প্রথম যে রক্ত আমি শেষ করেছি তা হচ্ছে, রবিয়া ইবনে হারেসের পুত্রের রক্ত। জাহেলী যুগের সুদ খতম করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যকার প্রথম যে সুদ আমি খতম করেছি তা হলো, আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের সুদ, এখন থেকে সুদ শেষ করে দেওয়া হলো। আর নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, তোমারা তাদের আল্লাহর আমানতের সাথে গ্রহণ করেছো, আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে হালাল করেছো। তাদের উপর তোমাদের অধিকার, তারা তোমাদের বিচানায় এমন কাউকে আসতে দিবেনা যাদের তোমরা পছন্দ করোনা। তোমাদের উপর তাদের অধিকার, তোমরা তাদের ভালো পানাহার ও পোশাক দিবে।
তোমাদের কাছে আমি এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা ধারণ করে থাকো তবে কখনও পথভ্রষ্ট হবেনা "তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব"।
মনে রেখো আমার পর কোন নবী নেই, তোমাদের পর কোন উম্মত নেই। আল্লাহর ইবাদত করবে, নামায আদায় করবে, রমজান মাসে রোজা রাখবে, আনন্দের সাথে নিজ সম্পদের যাকাত দিবে, আল্লাহর ঘরে হজ্জ করবে, নিজ শাসকদের আনুগত্য করবে, যদি এরুপ করো, তবে আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা কি বলবে ?
লক্ষ সাহাবী সমস্বরে বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি তাবলীগ করেছেন, পয়গাম পৌছে দিয়েছেন, কল্যাণ কামনার হক আদায় করেছেন। এ কথা শুনে বিশ্ব নবী মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) নিজের শাহাদাত আঙুল আকাশের দিকে তুলে লোকদের দিকে ঝুঁকে তিনবার বলেন, হে আমার রব, তুমি সাক্ষী থেকে।
তাঁর কথাগুলো হযরত রবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ উচ্চকণ্ঠে উপস্থিত সবার কাছে পৌছে দিচ্ছিলেন। আর আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর সেদিনের সাথীরা অঝোরে কান্না করছিলো। হযরত ওমর (রাঃ) কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, পূর্ণাঙ্গতার পরতো অপূর্ণাঙ্গতাই থেকে যায়।
ভাষণ শেষ করার পর আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাযিল করেন- "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পর্ণ করলাম, ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম"।
(সুরা মায়েদা, আয়াত-০৩)
লেখকঃ
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স)
এমএসএস (অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
নবী মুহাম্মদ (সঃ) আরাফাত ময়দানে ১০ যিলহজ্জ তারিখ কাসওয়া উটনীর পিঠে আসন গ্রহণ করেন, সে সময় প্রায় এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার সাহাবী তাঁর চারদিকে সমবেত ছিল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে মানবতার মহান মানব, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ) বলেন-
হে লোক সকল, আমার কথা শোনো, আমি জানিনা, এবারের পর আমি তোমাদের সাথে এই জায়গায় আর মিলিত হতে পারবো কিনা।
তোমাদের রক্ত ও ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্য আজকের দিন, বর্তমান মাস এবং এই শহরের মতই নিষিদ্ধ। শোনো মানুষ সকল, জাহেলিয়াত যুগের সবকিছু আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহেলিয়াতের খুনও খতম করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যকার প্রথম যে রক্ত আমি শেষ করেছি তা হচ্ছে, রবিয়া ইবনে হারেসের পুত্রের রক্ত। জাহেলী যুগের সুদ খতম করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যকার প্রথম যে সুদ আমি খতম করেছি তা হলো, আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের সুদ, এখন থেকে সুদ শেষ করে দেওয়া হলো। আর নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, তোমারা তাদের আল্লাহর আমানতের সাথে গ্রহণ করেছো, আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে হালাল করেছো। তাদের উপর তোমাদের অধিকার, তারা তোমাদের বিচানায় এমন কাউকে আসতে দিবেনা যাদের তোমরা পছন্দ করোনা। তোমাদের উপর তাদের অধিকার, তোমরা তাদের ভালো পানাহার ও পোশাক দিবে।
তোমাদের কাছে আমি এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা ধারণ করে থাকো তবে কখনও পথভ্রষ্ট হবেনা "তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব"।
মনে রেখো আমার পর কোন নবী নেই, তোমাদের পর কোন উম্মত নেই। আল্লাহর ইবাদত করবে, নামায আদায় করবে, রমজান মাসে রোজা রাখবে, আনন্দের সাথে নিজ সম্পদের যাকাত দিবে, আল্লাহর ঘরে হজ্জ করবে, নিজ শাসকদের আনুগত্য করবে, যদি এরুপ করো, তবে আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা কি বলবে ?
লক্ষ সাহাবী সমস্বরে বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি তাবলীগ করেছেন, পয়গাম পৌছে দিয়েছেন, কল্যাণ কামনার হক আদায় করেছেন। এ কথা শুনে বিশ্ব নবী মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) নিজের শাহাদাত আঙুল আকাশের দিকে তুলে লোকদের দিকে ঝুঁকে তিনবার বলেন, হে আমার রব, তুমি সাক্ষী থেকে।
তাঁর কথাগুলো হযরত রবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ উচ্চকণ্ঠে উপস্থিত সবার কাছে পৌছে দিচ্ছিলেন। আর আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর সেদিনের সাথীরা অঝোরে কান্না করছিলো। হযরত ওমর (রাঃ) কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, পূর্ণাঙ্গতার পরতো অপূর্ণাঙ্গতাই থেকে যায়।
ভাষণ শেষ করার পর আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাযিল করেন- "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পর্ণ করলাম, ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম"।
(সুরা মায়েদা, আয়াত-০৩)
লেখকঃ
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স)
এমএসএস (অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Thursday, May 16, 2019
কাগমারী সম্মেলন ও মাওলানা ভাসানীঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
কাগমারী সম্মেলন ও মাওলানা ভাসানীঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় সম্মেলন, পরবর্তীতে পাকিস্তানের
বিভক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে বিশেষ ইঙ্গিতবহ ভূমিকা রেখেছিল এই সম্মেলন। ১৯৫৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলার কাগমারী নামক স্থানে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৮ই ফেব্রুয়ারি ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। উক্ত সম্মেলনে ভাসানী পাকিস্তানী শাসকদের হুশিয়ার করে বলেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানে শোষণ অব্যাহত থাকে তবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে “আসসালামু আলাইকুম ” জানাতে বাধ্য হবেন এবং তিনি পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরোধিতা করে বলেন, এই চুক্তি জনগন মানেনা, মানতে পারেনা। কাগমারী সম্মেলনে প্রদত্ব বক্তব্যে মওলানা ভাসানী শেষ পর্যায়ে রেগে উঠে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কে লক্ষ্য করে বলে ছিলেন 'শহীদ, তুমি আজ আমাকে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সমর্থন করতে বলছো। তুমি যদি আমাকে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাস করো, আমি বলবো, 'না'! তুমি যদি আমাকে কামানের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাস করো আমি বলবো 'না'! 'না'! তুমি যদি আমাকে আমার কবরে গিয়েও জিজ্ঞাস করো সেখান থেকে আমি চিৎকার করে বলবো 'না' 'না'।
এই সভায় মওলানা ভাসানী তাঁর বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামু ওআলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে। এছাড়া কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সাময়িক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহ্রাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখান করলে, ১৮ই মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে মাওলানা ভাসানী পদত্যাগ করেন। একই বছর ২৫শে জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর পর থেকে সবসময় বাম ধারার রাজনীতির সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৫৭-র ৭ই অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১২ই অক্টোবর মাওলানা ভাসানীকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকার কারাগারে ৪ বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন।
লেখকঃ
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স)
এমএসএস (অর্থনীতি)
শহীদ তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লাহ আমাদের চেতনার অনুপ্রেরণাঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
শহীদ তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লাহ আমাদের স্বাধীনতার অনুপ্রেরণাঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
শহীদ তিতুমীর, যাঁর প্রকৃত নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী (জন্ম ২৭শে জানুয়ারী ১৭৮২, মৃত্যু ১৯শে নভেম্বর,১৮৩১) তার পিতার নাম সৈয়দ মীর হাসান আলী ও মাতার নাম আবিদা রুকাইয়া খাতুন। তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ও কৃষক প্রজার নেতা। ওয়াহাবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এই মহান বিপ্লবী । জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরূদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও বাঁশের কেল্লার নির্মাণের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। ব্রিটিশ সেনাদের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় এই বাঁশের কেল্লাতেই ১৯ নভেম্বর ১৮৩১ সালে ৪৯ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে যান এবং সেখানে স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ওয়াহাবী মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর তাঁর গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে 'তাহ্বান্দ' নামে এক ধরনের বস্ত্র পরিধান শুরু করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের উপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত 'দাঁড়ির খাজনা' এবং মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিতুমীর পালোয়ান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পূর্বে জমিদারের লাঠিয়াল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন।
তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে এক সময় পাঁচ হাজারে গিয়ে পৌঁছায় এবং তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।
১৮৩১ সালের ২৩শে অক্টোবর বারাসাতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে বাঁশ ও কাদা দিয়ে তারা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট বাঁশেরকেল্লা নির্মাণ করেন।
তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজয় বরণ করে। তন্মধ্যে বারাসতের বিদ্রোহ অন্যতম। ঐ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, "ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হার-জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যদা অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে । আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।"১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের আক্রমণ করে। তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। ১৪শে নভেম্বর তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। তাঁর বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
অনেক ঐতিহাসিক তিতুমীরের লড়াইকে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় আখ্যা দেন কারণ মূলত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে তিতু যুদ্ধঘোষণা করেছিলেন। একথা সত্য তিতুমীর প্রজাদের একজোট করেছিলেন ধর্ম এবং জেহাদের ডাক দিয়েছেন। অত্যাচারী হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায়কে আক্রমন, দেবনাথ রায় হত্যা, গো হত্যা ইত্যাদির উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। অপরপক্ষে অমলেন্দু দে'র ভাষায় তিতুমীরের লক্ষ্য ও পথ ছিল ইসলামে পূর্ন বিশ্বাস এবং হিন্দু কৃষকদিগকে সাথে নিয়ে ইংরেজ মদতপুষ্ট জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা। তিতুমীরের আক্রমের লক্ষ্যবস্তু হিন্দুদের পাশাপাশি ধনী মুসলমানও ছিল। তার বক্তৃতা শোনার জন্যে দলে দলে হিন্দু মুসলিম কৃষক জমা হতো। তিতুমীরের এই সংগ্রাম ছিল প্রকৃত কৃষক বিদ্রোহ যার অভিমুখ ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবরা। শহীদ তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লার আন্দোলন ছিল,এক কথায় ভারতবর্ষে ইংরেজ, জমিদার ও হিন্দু মহাজনদের অত্যাচারের বিরোদ্ধে কৃষক জনতার স্বাধীনতা ও মুক্তির আন্দোলন। যে ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ এ আমরা স্বাধীনতার প্রথম সোফান অর্জন করেছি।
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস(অনার্স)এমএসএস(অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শহীদ তিতুমীর, যাঁর প্রকৃত নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী (জন্ম ২৭শে জানুয়ারী ১৭৮২, মৃত্যু ১৯শে নভেম্বর,১৮৩১) তার পিতার নাম সৈয়দ মীর হাসান আলী ও মাতার নাম আবিদা রুকাইয়া খাতুন। তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ও কৃষক প্রজার নেতা। ওয়াহাবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এই মহান বিপ্লবী । জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরূদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও বাঁশের কেল্লার নির্মাণের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। ব্রিটিশ সেনাদের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় এই বাঁশের কেল্লাতেই ১৯ নভেম্বর ১৮৩১ সালে ৪৯ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে যান এবং সেখানে স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ওয়াহাবী মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর তাঁর গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে 'তাহ্বান্দ' নামে এক ধরনের বস্ত্র পরিধান শুরু করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের উপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত 'দাঁড়ির খাজনা' এবং মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিতুমীর পালোয়ান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পূর্বে জমিদারের লাঠিয়াল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন।
তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে এক সময় পাঁচ হাজারে গিয়ে পৌঁছায় এবং তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।
১৮৩১ সালের ২৩শে অক্টোবর বারাসাতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে বাঁশ ও কাদা দিয়ে তারা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট বাঁশেরকেল্লা নির্মাণ করেন।
তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজয় বরণ করে। তন্মধ্যে বারাসতের বিদ্রোহ অন্যতম। ঐ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, "ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হার-জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যদা অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে । আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।"১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের আক্রমণ করে। তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। ১৪শে নভেম্বর তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। তাঁর বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
অনেক ঐতিহাসিক তিতুমীরের লড়াইকে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় আখ্যা দেন কারণ মূলত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে তিতু যুদ্ধঘোষণা করেছিলেন। একথা সত্য তিতুমীর প্রজাদের একজোট করেছিলেন ধর্ম এবং জেহাদের ডাক দিয়েছেন। অত্যাচারী হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায়কে আক্রমন, দেবনাথ রায় হত্যা, গো হত্যা ইত্যাদির উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। অপরপক্ষে অমলেন্দু দে'র ভাষায় তিতুমীরের লক্ষ্য ও পথ ছিল ইসলামে পূর্ন বিশ্বাস এবং হিন্দু কৃষকদিগকে সাথে নিয়ে ইংরেজ মদতপুষ্ট জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা। তিতুমীরের আক্রমের লক্ষ্যবস্তু হিন্দুদের পাশাপাশি ধনী মুসলমানও ছিল। তার বক্তৃতা শোনার জন্যে দলে দলে হিন্দু মুসলিম কৃষক জমা হতো। তিতুমীরের এই সংগ্রাম ছিল প্রকৃত কৃষক বিদ্রোহ যার অভিমুখ ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবরা। শহীদ তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লার আন্দোলন ছিল,এক কথায় ভারতবর্ষে ইংরেজ, জমিদার ও হিন্দু মহাজনদের অত্যাচারের বিরোদ্ধে কৃষক জনতার স্বাধীনতা ও মুক্তির আন্দোলন। যে ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ এ আমরা স্বাধীনতার প্রথম সোফান অর্জন করেছি।
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস(অনার্স)এমএসএস(অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
Wednesday, May 15, 2019
ধর্মীয় সংস্কার ও ফরায়েজি আন্দোলনঃঃ (মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
ধর্মীয় সংস্কার ও ফরায়েজি আন্দোলনঃ
(মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম হয়েছিল ১৭৮১ সালে বাংলাদেশের মাদারিপুর জেলায় চর শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামের এক দরিদ্র তালুকদার পরিবারে। আর মৃত্যুবরণ করেন ১৮৪০ সালে। তিনি মক্কা শরীফে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে হজ পালনের গমন করেন, এবং মক্কায় প্রায় ২০ বছর অবস্থান করে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে বাংলায় ফিরে আসেন।
তিনি একজন আরবি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। এছাড়াও ধর্মীয় সংস্কারক, নীলকর ও সামন্তবাদ বিরোধী নেতা এবং ভারতবর্ষে সংঘটিত ফরায়জি আন্দোলন তারই নেতৃত্বে হয়েছিল। তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, ছিলেন কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার প্রধান সংগঠক ও নেতা।
দেশে ফিরে তিনি আরবের ওয়াহাবী আন্দোলনের আদলে ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তার প্রবর্তিত ধর্মমত ছিল আধুনিক ও মানবতাবাদী। মুসলিম ধর্মের উৎপীড়নমূলক নিয়ম রদ করে ভন্ড মোল্লা মৌলবীদের হাত থেকে তার শিষ্যদের রক্ষা করেন। একারনে রক্ষণশীল ধনী মুসলমানেরা তাকে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করে। ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার অসংখ্য কৃষক তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিল। তার ছেলে দুদু মিয়াও একজন ঐতিহাসিক যোদ্ধা এবং ফরায়েজী আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি নীলকরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এদেশ থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানোতে ভূমিকা রেখেছেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ'র নামানুসারে বাংলাদেশের শরিয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে মাদারিপুরের শিবচরে আড়িয়াল নদীর উপরে নির্মিত সেতুটির নাম করণ করা হয়েছে-
"হাজী শরীয়তুল্লাহ সেতু"
ফরায়েজী আন্দোলন ঊনিশ শতকে বাংলায় গড়ে ওঠা একটি সংস্কার আন্দোলন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্কার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনে আর্থ-সামাজিক সংস্কারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফরায়েজী শব্দটি ‘ফরজ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কাজেই ফরায়েজী বলতে তাদেরকেই বোঝায় যাদের লক্ষ্য হচ্ছে অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্যসমূহ কার্যকর করা।
এ আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি অবশ্য শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, অবশ্য পালনীয়ই হোক বা ঐচ্ছিকই হোক, কুরআন ও সুন্নার নির্দেশিত সকল ধর্মীয় কর্তব্যই এর অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তউল্লাহ হজ্ব পালনের জন্য মক্কায় যান এবং সেখানে হানাফি শাস্ত্রজ্ঞ শেখ তাহির সোম্বলের নিকট ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান যে, বাংলার মুসলমানদের একটি অংশ বহুবিধ স্থানীয় লোকাচার ও পর্ব-উৎসব পালনে উৎসাহী হয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রতি চরম উদাসীন হয়ে উঠেছেন। সে কারণেই তিনি ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন এবং কালক্রমে এ আন্দোলন সমগ্র পূর্ববঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
হাজী শরীয়তউল্লাহ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনকে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করতেন। হানাফি আইনের অনুসরণে তিনি মত প্রকাশ করেন যে, বাংলায় বৈধভাবে নিযুক্ত একজন মুসলিম শাসকের অনুপস্থিতি মুসলমানদের জুমআর নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠানের সুযোগ হতে বঞ্চিত করেছে। এ মত ছিল ফরায়েজী আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য যা একে ওই সময়ের অপরাপর পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন থেকে আলাদা করে তুলেছে।
হাজী শরীয়তউল্লাহ মনে করতেন, আজ বাংলার মুসলিম সমাজ নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন ও অসচেতন। মুসলমান কৃষকদের আত্মসচেতন ও উজ্জীবিত করার কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ছিলেন, একজন একনিষ্ঠ ধর্মপ্রচারক ও সহানুভূতিশীল কৃষক দরদী । ফরায়েজী আন্দোলন অসামান্য দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা, ফরিদপুর,বরিশাল,ময়মনসিংহ, কুমিল্লা,চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলাসমূহে এবং আসাম প্রদেশে বিস্তারলাভ করে। যেসব এলাকায় নব্য হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরগণ শক্তিশালী ছিল এবং কৃষকদের উপর অত্যাচার চালাত সেসকল এলাকায় এ আন্দোলন সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
কিন্তু সমকালীন বাঙালি সমাজে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ফরায়েজী আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে পারেনি। ভূস্বামী শ্রেণি এর স্বার্থ রক্ষার্থে ফরায়েজী ও রক্ষণশীল গোঁড়া মুসলমানদের মধ্যে বিরোধে হস্তক্ষেপ করে। ঢাকার জমিদারগণ পুলিশের সহায়তায় রামনগরে অবস্থিত প্রচারকেন্দ্র থেকে শরীয়তউল্লাহকে বহিষ্কার করেন। হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের সঙ্গে অবিরাম সংঘর্ষের ফলে আন্দোলনটি ক্রমান্বয়ে আর্থ-সামাজিক রূপে চুয়ান্ত সফল হয়নি।
উনিশ শতকে মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নব্য জমিদারগণ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন বহু অতিরিক্ত অবৈধ কর কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেয়। এমনকি, তারা মুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে কালীপুজা, দুর্গাপূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য কর আদায় করত। শরীয়তউল্লাহ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং জমিদারদের এসকল অবৈধ কর প্রদান না করার জন্য তার শিষ্যদের নির্দেশ দেন। জমিদার গণ ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। গরু কোরবানি করা মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা এবং মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে অন্যান্য মাংসের তুলনায় গরুর মাংসের মূল্য কম বিধায় শরীয়তউল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার জন্য মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন।
কলকাতার সংবাদপত্র এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনাকালে ফরায়েজীদের বিদ্রোহী ভাবাপন্ন দল হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচারাভিযান শুরু করে। ১৮৩৭ সালে জমিদারগণ শরীয়তউল্লাহকে তিতুমীর এর ন্যায় একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তারা ফরায়েজীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে এবং এ কাজে তারা ইউরোপীয় নীলকরদের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করে। কিন্তু তাদের অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হওয়ায় কোন অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে পারে নি। অবশ্য ফরিদপুরে শান্তিভঙ্গ ও গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে ১৮৩৯ সালে শরীয়তউল্লাহ একাধিকবার পুলিশি হেফাজতে ছিলেন।
১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র মুহসীন উদ্দীন ওরফে দুদু মিয়াকে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা ঘোষণা করা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রণোদিত একটি জমিদার শ্রেণি গড়ে তোলে। প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে যতটা সম্ভব অর্থ আদায় করা ছাড়া অপর কোন চিন্তাই তাদের ছিল না। তারা বহুসংখ্যক লাঠিয়াল পুষত এবং তাদের সাহায্যে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাত।
এ ব্যবস্থা জমিদারদের বস্ত্তত সামন্তাধিকার প্রদান করে এবং কৃষক শ্রেণিকে প্রায় ভূমিদাসে পরিণত করে। কলকাতার আদালত ছিল দরিদ্র কৃষকদের আওতার বাইরে। জমিদারদের যৌক্তিক পথে আনার জন্য শক্তি প্রয়োগ ছাড়া দুদু মিয়ার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি কানাইপুরের শিকদার পরিবার ও ফরিদপুরের ঘোষদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এরূপ এক সংঘর্ষে মদন ঘোষ নিহত হন। এর ফলে ১১৭ জন ফরায়েজী আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন এবং তাদের মধ্যে ২২ জন দায়রা জজ কর্তৃক ৭ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন। দুদু মিয়া সহ অন্যান্যরা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
দুদু মিয়ার এই প্রাথমিক বিজয় জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাদের কাছে তাঁর সম্মান অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ ঘটনাপ্রবাহ ফরায়েজী আন্দোলনের প্রসারে আরও প্রেরণা যোগায়। এতদিন যেসব মুসলমান আন্দোলন থেকে দূরে ছিল শুধু তারাই যে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তা নয়, জমিদারদের বিরুদ্ধে দুদু মিয়ার সাহায্য লাভের জন্য হিন্দু ও দেশীয় খ্রিস্টানগণও এ আন্দোলনে যোগ দেয়।
জমিদারদের প্ররোচনায় এন্ড্রু ডানলপ্ নামের একজন প্রভাবশালী নীলকর দুদু মিয়ার চরম শক্রতে পরিণত হয়। কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলাল নামের এক মাড়োয়ারি হিন্দু পাঁচচরে ডানলপের নীলকুঠির গোমস্তা ছিলেন। ১৮৪৬ সালের অক্টোবর মাসে পাঁচচরের হিন্দু বাবুদের সঙ্গে মিলে আনুমানিক সাত-আটশ’ লোক নিয়ে কাঞ্জিলাল বাহাদুরপুরে দুদু মিয়ার বাড়ি আক্রমণ করেন। দুদু মিয়ার অভিযোগ মতে তারা সামনের দরজা ভেঙে ফেলে, চার জন পাহারাদারকে হত্যা করে এবং অন্যান্যদের মারাত্মকভাবে জখম করে নগদ অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ কেড়ে নেয়। ঘটনাটি পুলিশকে জানালে হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে শুধুমাত্র আহত ব্যক্তিদের বিচারার্থে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণ করেন।
ডানলপের গোমস্তা কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলালের সঙ্গে এ সংঘর্ষের কারণে দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে দায়রায় সোপর্দ করা হয়। দায়রা আদালত দুদু মিয়া ও তার ৪০ জন অনুসারীকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে। কিন্ত প্রদত্ত গুরুদন্ড এ আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় রায়টি অনুমোদনের জন্য কলকাতায় সদর নিজামত আদালতে প্রেরণ করা হয়। সদর নিজামত আদালত ফরিয়াদির অভিযোগের বর্ণনা অংশত চরম অবাস্তব এবং অংশত একদম অবিশ্বাস্য বলে মনে করে। ফলে তারা সবাই খালাস পেয়ে যান। দুদু মিয়ার অনুসারিগণ একে নিপীড়িত কৃষককুলের জন্য এক মহাবিজয় বলে স্বাগত জানায়।
১৮৬২ সালে দুদু মিয়া মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার নাবালক পুত্র গিয়াসউদ্দীন হায়দার ও আবদুল গফুর ওরফে নয়া মিয়ার তত্ত্বাবধানের জন্য একটি অভিভাবক পরিষদ গঠন করেন। এ দুই পুত্র পরপর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। পরিষদ ক্ষীয়মান আন্দোলনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। নয়া মিয়ার বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে এবং তার নেতৃত্বে আন্দোলন হারানো শক্তি কিছুটা ফিরে পায়। মাদারীপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন বিচক্ষণতার সঙ্গে পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে ফরায়েজী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলেন। ফরায়েজী নেতৃবৃন্দও তাদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করে।
১৮৮৪ সালে নয়া মিয়ার মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার তৃতীয় ও কনিষ্ঠতম পুত্র সৈয়দউদ্দীন আহমদ ফরায়েজীদের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর সময়ে তাইয়ুনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘর্ষ চরমে পৌঁছে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্ক পূর্ববঙ্গে নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। সরকার সৈয়দউদ্দীনকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এর প্রশ্নে তিনি বিভাজনের পক্ষে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। কিন্তু ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
খান বাহাদুর সৈয়দউদ্দীনের পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র রশিদউদ্দীন আহমদ ওরফে বাদশা মিয়া ফরায়েজী নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বের প্রথমদিকে বাদশা মিয়া সরকারের প্রতি সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ তাকে ব্রিটিশ বিরোধী করে তোলে এবং তিনি খেলাফত ও অসহযোগী আন্দোলনে যোগ দেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জে ফরায়েজীদের এক সম্মেলন আহবান করে পাকিস্তানকে ‘দারুল ইসলাম’ বলে ঘোষণা করেন এবং তার অনুসারীদের জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করেন।
ফরায়েজীগণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মানুশীলনে কতিপয় স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যসহ হানাফি মযহাবের অনুসারী ছিল। ঐ বৈশিষ্ট্যগুলিকে মোটামুটি পাঁচটি ফরায়েযী মতবাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়:
১. তওবা অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে অতীত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
২. ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ কঠোরভাবে পালন করা। ৩. কুরআন নির্দেশিত তৌহিদ বা একেশ্বরবাদ।
৪. ভারতবর্ষ ‘দারুল হরব’ বিধায় এখানে জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠান অত্যাবশ্যকীয় নয়।
৫. কুরআন ও সুন্নাহ বহির্ভূত সকল লোকাচার ও অনুষ্ঠানকে ‘বিদাত’ বলে পরিহার করা।
পীর ও ‘মুরিদ’ অভিধার পরিবর্তে ফরায়েজীদের নেতাকে ‘ওস্তাদ’ বা শিক্ষক এবং তার অনুসারীদের ‘শাগরিদ’ বা শিষ্য বলা। ফরায়েজী জামায়াতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিকে ‘তওবার মুসলিম’ বা ‘মুমিন’ বলা।
ফরায়েজীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে দুদু মিয়ার দুটি লক্ষ্য ছিল: ১. হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচার থেকে ফরায়েজী কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষা করা এবং ২. জনগণের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম লক্ষ্যটি অর্জনের জন্য তিনি এক স্বেচ্ছাসেবক লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি অর্জনের জন্য তিনি ফরায়েজীদের নেতৃত্বে সনাতন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা (পঞ্চায়েত) পুনঃপ্রবর্তন করেন। প্রথমোক্তটি ‘সিয়াসতি’ বা রাজনৈতিক শাখা এবং পরেরটি ‘দ্বীনি’ বা ধর্মীয় শাখা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এ দুটি শাখা একীভূত করে ‘খিলাফত’ ব্যবস্থার রূপ দেওয়া হয়।
ফরায়েজী খিলাফত পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল সকল ফরায়েজীকে দুদু মিয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের (খলিফা) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা। খলিফাদের এই পরম্পরায় সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ‘ওস্তাদ’ দুদু মিয়া। তিনি তিন পদমর্যাদার খলিফা নিয়োগ করেন: উপরস্থ খলিফা, তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও গাঁও খলিফা।
দুদু মিয়া ফরায়েজী বসতি এলাকাকে ৩০০ থেকে ৫০০ পরিবারের এক একটি ছোট এককে বিভক্ত করেন এবং প্রতি এককে একজন গাঁও বা ওয়ার্ড খলিফা নিযুক্ত করেন। অনুরূপ দশ বা তদোধিক একক নিয়ে একটি সার্কেল বা গির্দ গঠিত হতো। প্রতিটি সার্কেল বা গির্দে একজন করে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা নিয়োজিত হতেন। তত্ত্বাবধায়ক খলিফাকে একজন পিয়ন ও একজন পেয়াদা বা পাহারাদার দেওয়া হতো। এই পিয়ন ও পেয়াদারা একদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফার সঙ্গে গাঁও খলিফাদের এবং অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও ওস্তাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত। ‘উপরস্থ খলিফা’গণ ছিলেন ওস্তাদের উপদেষ্টা এবং তারা ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কার্যালয় বাহাদুরপুরে ওস্তাদের সঙ্গে অবস্থান করতেন।
গাঁও খলিফা একজন সমাজপতির ভূমিকা পালন করতেন যার দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় কর্তব্য পালনে লোককে উদ্বুদ্ধ করা, খানকাহও মসজিদ সংরক্ষণ, নৈতিকতা পর্যবেক্ষণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারকার্য সম্পন্ন করা। কুরআন শিক্ষা এবং ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের লক্ষ্যে একটি মকতব পরিচালনাও তার দায়িত্ব ছিল। তত্ত্বাবধায়ক খলিফার প্রধান দায়িত্ব ছিল গাঁও খলিফাদের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা, তার অধীনস্থ গির্দের ফরায়েজীদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ রাখা, ধর্মের মৌলনীতি প্রচার এবং সর্বোপরি গাঁও খলিফাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোন আপিল মামলার নিষ্পত্তি করা। এরূপ ক্ষেত্রে তিনি তার গির্দের খলিফাদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদে বসে আপিল মামলার শুনানি গ্রহণ করতেন। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সকল বিষয়ে দুদু মিয়ার সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত এবং ওস্তাদ হিসেবে তিনি চূড়ান্ত আপিল আদালত হিসেবে কাজ করতেন।
ফরায়েজী আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক দিক হলো নবসৃষ্ট জমিদারদের নিপীড়ন প্রতিরোধের জন্য জনগণের একটি সুসংগঠিত পদক্ষেপ। এতে জমিদার ও নীলকরদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষক সম্প্রদায়ের অসন্তোষের তীব্রতার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি ছিল জনতার কাতার থেকে এক ধরনের সফল নেতৃত্ব গড়ে উঠার একটি উদাহরণ।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
(মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম হয়েছিল ১৭৮১ সালে বাংলাদেশের মাদারিপুর জেলায় চর শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামের এক দরিদ্র তালুকদার পরিবারে। আর মৃত্যুবরণ করেন ১৮৪০ সালে। তিনি মক্কা শরীফে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে হজ পালনের গমন করেন, এবং মক্কায় প্রায় ২০ বছর অবস্থান করে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে বাংলায় ফিরে আসেন।
তিনি একজন আরবি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। এছাড়াও ধর্মীয় সংস্কারক, নীলকর ও সামন্তবাদ বিরোধী নেতা এবং ভারতবর্ষে সংঘটিত ফরায়জি আন্দোলন তারই নেতৃত্বে হয়েছিল। তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, ছিলেন কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার প্রধান সংগঠক ও নেতা।
দেশে ফিরে তিনি আরবের ওয়াহাবী আন্দোলনের আদলে ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তার প্রবর্তিত ধর্মমত ছিল আধুনিক ও মানবতাবাদী। মুসলিম ধর্মের উৎপীড়নমূলক নিয়ম রদ করে ভন্ড মোল্লা মৌলবীদের হাত থেকে তার শিষ্যদের রক্ষা করেন। একারনে রক্ষণশীল ধনী মুসলমানেরা তাকে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করে। ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার অসংখ্য কৃষক তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিল। তার ছেলে দুদু মিয়াও একজন ঐতিহাসিক যোদ্ধা এবং ফরায়েজী আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি নীলকরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এদেশ থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানোতে ভূমিকা রেখেছেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ'র নামানুসারে বাংলাদেশের শরিয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে মাদারিপুরের শিবচরে আড়িয়াল নদীর উপরে নির্মিত সেতুটির নাম করণ করা হয়েছে-
"হাজী শরীয়তুল্লাহ সেতু"
ফরায়েজী আন্দোলন ঊনিশ শতকে বাংলায় গড়ে ওঠা একটি সংস্কার আন্দোলন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্কার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনে আর্থ-সামাজিক সংস্কারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফরায়েজী শব্দটি ‘ফরজ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কাজেই ফরায়েজী বলতে তাদেরকেই বোঝায় যাদের লক্ষ্য হচ্ছে অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্যসমূহ কার্যকর করা।
এ আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি অবশ্য শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, অবশ্য পালনীয়ই হোক বা ঐচ্ছিকই হোক, কুরআন ও সুন্নার নির্দেশিত সকল ধর্মীয় কর্তব্যই এর অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তউল্লাহ হজ্ব পালনের জন্য মক্কায় যান এবং সেখানে হানাফি শাস্ত্রজ্ঞ শেখ তাহির সোম্বলের নিকট ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান যে, বাংলার মুসলমানদের একটি অংশ বহুবিধ স্থানীয় লোকাচার ও পর্ব-উৎসব পালনে উৎসাহী হয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রতি চরম উদাসীন হয়ে উঠেছেন। সে কারণেই তিনি ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন এবং কালক্রমে এ আন্দোলন সমগ্র পূর্ববঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
হাজী শরীয়তউল্লাহ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনকে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করতেন। হানাফি আইনের অনুসরণে তিনি মত প্রকাশ করেন যে, বাংলায় বৈধভাবে নিযুক্ত একজন মুসলিম শাসকের অনুপস্থিতি মুসলমানদের জুমআর নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠানের সুযোগ হতে বঞ্চিত করেছে। এ মত ছিল ফরায়েজী আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য যা একে ওই সময়ের অপরাপর পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন থেকে আলাদা করে তুলেছে।
হাজী শরীয়তউল্লাহ মনে করতেন, আজ বাংলার মুসলিম সমাজ নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন ও অসচেতন। মুসলমান কৃষকদের আত্মসচেতন ও উজ্জীবিত করার কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ছিলেন, একজন একনিষ্ঠ ধর্মপ্রচারক ও সহানুভূতিশীল কৃষক দরদী । ফরায়েজী আন্দোলন অসামান্য দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা, ফরিদপুর,বরিশাল,ময়মনসিংহ, কুমিল্লা,চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলাসমূহে এবং আসাম প্রদেশে বিস্তারলাভ করে। যেসব এলাকায় নব্য হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরগণ শক্তিশালী ছিল এবং কৃষকদের উপর অত্যাচার চালাত সেসকল এলাকায় এ আন্দোলন সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
কিন্তু সমকালীন বাঙালি সমাজে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ফরায়েজী আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে পারেনি। ভূস্বামী শ্রেণি এর স্বার্থ রক্ষার্থে ফরায়েজী ও রক্ষণশীল গোঁড়া মুসলমানদের মধ্যে বিরোধে হস্তক্ষেপ করে। ঢাকার জমিদারগণ পুলিশের সহায়তায় রামনগরে অবস্থিত প্রচারকেন্দ্র থেকে শরীয়তউল্লাহকে বহিষ্কার করেন। হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের সঙ্গে অবিরাম সংঘর্ষের ফলে আন্দোলনটি ক্রমান্বয়ে আর্থ-সামাজিক রূপে চুয়ান্ত সফল হয়নি।
উনিশ শতকে মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নব্য জমিদারগণ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন বহু অতিরিক্ত অবৈধ কর কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেয়। এমনকি, তারা মুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে কালীপুজা, দুর্গাপূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য কর আদায় করত। শরীয়তউল্লাহ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং জমিদারদের এসকল অবৈধ কর প্রদান না করার জন্য তার শিষ্যদের নির্দেশ দেন। জমিদার গণ ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। গরু কোরবানি করা মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা এবং মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে অন্যান্য মাংসের তুলনায় গরুর মাংসের মূল্য কম বিধায় শরীয়তউল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার জন্য মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন।
কলকাতার সংবাদপত্র এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনাকালে ফরায়েজীদের বিদ্রোহী ভাবাপন্ন দল হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচারাভিযান শুরু করে। ১৮৩৭ সালে জমিদারগণ শরীয়তউল্লাহকে তিতুমীর এর ন্যায় একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তারা ফরায়েজীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে এবং এ কাজে তারা ইউরোপীয় নীলকরদের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করে। কিন্তু তাদের অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হওয়ায় কোন অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে পারে নি। অবশ্য ফরিদপুরে শান্তিভঙ্গ ও গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে ১৮৩৯ সালে শরীয়তউল্লাহ একাধিকবার পুলিশি হেফাজতে ছিলেন।
১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র মুহসীন উদ্দীন ওরফে দুদু মিয়াকে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা ঘোষণা করা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রণোদিত একটি জমিদার শ্রেণি গড়ে তোলে। প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে যতটা সম্ভব অর্থ আদায় করা ছাড়া অপর কোন চিন্তাই তাদের ছিল না। তারা বহুসংখ্যক লাঠিয়াল পুষত এবং তাদের সাহায্যে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাত।
এ ব্যবস্থা জমিদারদের বস্ত্তত সামন্তাধিকার প্রদান করে এবং কৃষক শ্রেণিকে প্রায় ভূমিদাসে পরিণত করে। কলকাতার আদালত ছিল দরিদ্র কৃষকদের আওতার বাইরে। জমিদারদের যৌক্তিক পথে আনার জন্য শক্তি প্রয়োগ ছাড়া দুদু মিয়ার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি কানাইপুরের শিকদার পরিবার ও ফরিদপুরের ঘোষদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এরূপ এক সংঘর্ষে মদন ঘোষ নিহত হন। এর ফলে ১১৭ জন ফরায়েজী আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন এবং তাদের মধ্যে ২২ জন দায়রা জজ কর্তৃক ৭ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন। দুদু মিয়া সহ অন্যান্যরা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
দুদু মিয়ার এই প্রাথমিক বিজয় জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাদের কাছে তাঁর সম্মান অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ ঘটনাপ্রবাহ ফরায়েজী আন্দোলনের প্রসারে আরও প্রেরণা যোগায়। এতদিন যেসব মুসলমান আন্দোলন থেকে দূরে ছিল শুধু তারাই যে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তা নয়, জমিদারদের বিরুদ্ধে দুদু মিয়ার সাহায্য লাভের জন্য হিন্দু ও দেশীয় খ্রিস্টানগণও এ আন্দোলনে যোগ দেয়।
জমিদারদের প্ররোচনায় এন্ড্রু ডানলপ্ নামের একজন প্রভাবশালী নীলকর দুদু মিয়ার চরম শক্রতে পরিণত হয়। কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলাল নামের এক মাড়োয়ারি হিন্দু পাঁচচরে ডানলপের নীলকুঠির গোমস্তা ছিলেন। ১৮৪৬ সালের অক্টোবর মাসে পাঁচচরের হিন্দু বাবুদের সঙ্গে মিলে আনুমানিক সাত-আটশ’ লোক নিয়ে কাঞ্জিলাল বাহাদুরপুরে দুদু মিয়ার বাড়ি আক্রমণ করেন। দুদু মিয়ার অভিযোগ মতে তারা সামনের দরজা ভেঙে ফেলে, চার জন পাহারাদারকে হত্যা করে এবং অন্যান্যদের মারাত্মকভাবে জখম করে নগদ অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ কেড়ে নেয়। ঘটনাটি পুলিশকে জানালে হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে শুধুমাত্র আহত ব্যক্তিদের বিচারার্থে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণ করেন।
ডানলপের গোমস্তা কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলালের সঙ্গে এ সংঘর্ষের কারণে দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে দায়রায় সোপর্দ করা হয়। দায়রা আদালত দুদু মিয়া ও তার ৪০ জন অনুসারীকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে। কিন্ত প্রদত্ত গুরুদন্ড এ আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় রায়টি অনুমোদনের জন্য কলকাতায় সদর নিজামত আদালতে প্রেরণ করা হয়। সদর নিজামত আদালত ফরিয়াদির অভিযোগের বর্ণনা অংশত চরম অবাস্তব এবং অংশত একদম অবিশ্বাস্য বলে মনে করে। ফলে তারা সবাই খালাস পেয়ে যান। দুদু মিয়ার অনুসারিগণ একে নিপীড়িত কৃষককুলের জন্য এক মহাবিজয় বলে স্বাগত জানায়।
১৮৬২ সালে দুদু মিয়া মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার নাবালক পুত্র গিয়াসউদ্দীন হায়দার ও আবদুল গফুর ওরফে নয়া মিয়ার তত্ত্বাবধানের জন্য একটি অভিভাবক পরিষদ গঠন করেন। এ দুই পুত্র পরপর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। পরিষদ ক্ষীয়মান আন্দোলনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। নয়া মিয়ার বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে এবং তার নেতৃত্বে আন্দোলন হারানো শক্তি কিছুটা ফিরে পায়। মাদারীপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন বিচক্ষণতার সঙ্গে পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে ফরায়েজী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলেন। ফরায়েজী নেতৃবৃন্দও তাদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করে।
১৮৮৪ সালে নয়া মিয়ার মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার তৃতীয় ও কনিষ্ঠতম পুত্র সৈয়দউদ্দীন আহমদ ফরায়েজীদের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর সময়ে তাইয়ুনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘর্ষ চরমে পৌঁছে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্ক পূর্ববঙ্গে নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। সরকার সৈয়দউদ্দীনকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এর প্রশ্নে তিনি বিভাজনের পক্ষে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। কিন্তু ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
খান বাহাদুর সৈয়দউদ্দীনের পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র রশিদউদ্দীন আহমদ ওরফে বাদশা মিয়া ফরায়েজী নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বের প্রথমদিকে বাদশা মিয়া সরকারের প্রতি সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ তাকে ব্রিটিশ বিরোধী করে তোলে এবং তিনি খেলাফত ও অসহযোগী আন্দোলনে যোগ দেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জে ফরায়েজীদের এক সম্মেলন আহবান করে পাকিস্তানকে ‘দারুল ইসলাম’ বলে ঘোষণা করেন এবং তার অনুসারীদের জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করেন।
ফরায়েজীগণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মানুশীলনে কতিপয় স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যসহ হানাফি মযহাবের অনুসারী ছিল। ঐ বৈশিষ্ট্যগুলিকে মোটামুটি পাঁচটি ফরায়েযী মতবাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়:
১. তওবা অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে অতীত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
২. ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ কঠোরভাবে পালন করা। ৩. কুরআন নির্দেশিত তৌহিদ বা একেশ্বরবাদ।
৪. ভারতবর্ষ ‘দারুল হরব’ বিধায় এখানে জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠান অত্যাবশ্যকীয় নয়।
৫. কুরআন ও সুন্নাহ বহির্ভূত সকল লোকাচার ও অনুষ্ঠানকে ‘বিদাত’ বলে পরিহার করা।
পীর ও ‘মুরিদ’ অভিধার পরিবর্তে ফরায়েজীদের নেতাকে ‘ওস্তাদ’ বা শিক্ষক এবং তার অনুসারীদের ‘শাগরিদ’ বা শিষ্য বলা। ফরায়েজী জামায়াতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিকে ‘তওবার মুসলিম’ বা ‘মুমিন’ বলা।
ফরায়েজীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে দুদু মিয়ার দুটি লক্ষ্য ছিল: ১. হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচার থেকে ফরায়েজী কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষা করা এবং ২. জনগণের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম লক্ষ্যটি অর্জনের জন্য তিনি এক স্বেচ্ছাসেবক লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি অর্জনের জন্য তিনি ফরায়েজীদের নেতৃত্বে সনাতন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা (পঞ্চায়েত) পুনঃপ্রবর্তন করেন। প্রথমোক্তটি ‘সিয়াসতি’ বা রাজনৈতিক শাখা এবং পরেরটি ‘দ্বীনি’ বা ধর্মীয় শাখা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এ দুটি শাখা একীভূত করে ‘খিলাফত’ ব্যবস্থার রূপ দেওয়া হয়।
ফরায়েজী খিলাফত পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল সকল ফরায়েজীকে দুদু মিয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের (খলিফা) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা। খলিফাদের এই পরম্পরায় সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ‘ওস্তাদ’ দুদু মিয়া। তিনি তিন পদমর্যাদার খলিফা নিয়োগ করেন: উপরস্থ খলিফা, তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও গাঁও খলিফা।
দুদু মিয়া ফরায়েজী বসতি এলাকাকে ৩০০ থেকে ৫০০ পরিবারের এক একটি ছোট এককে বিভক্ত করেন এবং প্রতি এককে একজন গাঁও বা ওয়ার্ড খলিফা নিযুক্ত করেন। অনুরূপ দশ বা তদোধিক একক নিয়ে একটি সার্কেল বা গির্দ গঠিত হতো। প্রতিটি সার্কেল বা গির্দে একজন করে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা নিয়োজিত হতেন। তত্ত্বাবধায়ক খলিফাকে একজন পিয়ন ও একজন পেয়াদা বা পাহারাদার দেওয়া হতো। এই পিয়ন ও পেয়াদারা একদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফার সঙ্গে গাঁও খলিফাদের এবং অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও ওস্তাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত। ‘উপরস্থ খলিফা’গণ ছিলেন ওস্তাদের উপদেষ্টা এবং তারা ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কার্যালয় বাহাদুরপুরে ওস্তাদের সঙ্গে অবস্থান করতেন।
গাঁও খলিফা একজন সমাজপতির ভূমিকা পালন করতেন যার দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় কর্তব্য পালনে লোককে উদ্বুদ্ধ করা, খানকাহও মসজিদ সংরক্ষণ, নৈতিকতা পর্যবেক্ষণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারকার্য সম্পন্ন করা। কুরআন শিক্ষা এবং ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের লক্ষ্যে একটি মকতব পরিচালনাও তার দায়িত্ব ছিল। তত্ত্বাবধায়ক খলিফার প্রধান দায়িত্ব ছিল গাঁও খলিফাদের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা, তার অধীনস্থ গির্দের ফরায়েজীদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ রাখা, ধর্মের মৌলনীতি প্রচার এবং সর্বোপরি গাঁও খলিফাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোন আপিল মামলার নিষ্পত্তি করা। এরূপ ক্ষেত্রে তিনি তার গির্দের খলিফাদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদে বসে আপিল মামলার শুনানি গ্রহণ করতেন। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সকল বিষয়ে দুদু মিয়ার সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত এবং ওস্তাদ হিসেবে তিনি চূড়ান্ত আপিল আদালত হিসেবে কাজ করতেন।
ফরায়েজী আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক দিক হলো নবসৃষ্ট জমিদারদের নিপীড়ন প্রতিরোধের জন্য জনগণের একটি সুসংগঠিত পদক্ষেপ। এতে জমিদার ও নীলকরদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষক সম্প্রদায়ের অসন্তোষের তীব্রতার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি ছিল জনতার কাতার থেকে এক ধরনের সফল নেতৃত্ব গড়ে উঠার একটি উদাহরণ।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বাধীনতার প্রথম উদিত সূর্য "শহীদ মঙ্গল পান্ডে"
স্বাধীনতার প্রথম উদিত সূর্য "
শহীদ মঙ্গল পান্ডে"
শহীদ মঙ্গল পান্ডের জন্ম ১৯ জুলাই, ১৮২৭ আর মৃত্যু ৮ এপ্রিল, ১৮৫৭। তার আদি বাড়ি ছিল উত্তর প্রদেশের বালিয়া জেলার নাগওয়া গ্রামে।
ইংরেজ কোম্পানি সরকারের বিরোদ্ধে সিপাই বিদ্রোহ বা জাতীয় মহাবিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিল মঙ্গল পান্ডের হাত ধরে,কলকাতার উপকন্ঠে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ব্যারাকপুরে। সিপাইদের প্যারেড গ্রাউন্ডে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ইংরেজ বিরোধী অভ্যুত্থানের ডাক দেন সিপাই মঙ্গল। বিদ্রোহী মঙ্গলকে নিবৃত্ত করতে আসা দুই ইংরেজ অফিসার অ্যাডজুট্যান্ট লেফটেন্যান্ট বাগ এবং সার্জেন্ট মেজরকে প্রকাশ্যে হত্যা করে বিদ্রোহের সূচনা করেন। ইংরেজ বাহিনী কর্তৃক ঘেরাওয়ের পূর্বমুহূর্তে আত্মসমর্পনের বদলে বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল মঙ্গল পান্ডে, পরে গুলিবিদ্ধ মঙ্গল পান্ডেকে হসপিটালে ভর্তি করেন ইংরেজ সরকার। সুস্থ হওয়ার পর প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয় ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল। ইংরেজ অফিসারদের আদেশ অমান্য করা ও মঙ্গল পান্ডেকে নিবৃত্ত না করে সহযোগীতার অপরাধে অপর এক ভারতীয় সিপাই ঈশ্বরী প্রসাদ পান্ডেকে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ, রোববার অপরাহ্নে বারাকপুর সৈনিক নিবাসে ফাঁসি দেয় ইংরেজ সরকার।
কলকাতার ব্যারাকপুরে সিপাইদের প্যারেড গ্রাউন্ডে ইংরেজ বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রথম প্রকাশ্যে ডাক দিয়েছিলেন সিপাই মঙ্গল পান্ডে।
মঙ্গল পান্ডে প্যারেড গ্রাউন্ডের সমস্ত সেপাইদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, “ভাইসব, আর সময় নেই! যদি নিজেদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য, ধর্ম ফিরিঙ্গীর হাতে দলিত করতে না চাও তবে এগিয়ে এস। ধর কৃপাণ!”
“বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো ভাইসব। ফিরিঙ্গীর পায়ের তলায় আর কতদিন পড়ে থাকবে! ওরা আমাদের সোনার দেশ লুটেপুটে খাচ্ছে, আর আমরা না খেয়ে মরছি। ওরা আমাদের ধর্মের উপর হাত দিয়েছে, আমাদের জাতিভ্রষ্ট করছে। ভাইসব ফিরিঙ্গীদের মারো, একটা একটা করে সব ব্যাটাকে মারো; ফিরিঙ্গীদের খতম করে দেশকে স্বাধীন কর”।
মঙ্গল পাণ্ডে ব্যারাকপুরে এভাবেই সিপাহী বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। যে বিদ্রোহ খুব শীঘ্রই মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি এটা সারা বাংলাদেশ জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৫৭ সালের ১১ মে মিরাট থেকে তিনশ’ বিদ্রোহী সিপাই দিল্লি এসে ৪৯ জন ব্রিটিশ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে এবং দিল্লির দখল হাতে নিয়ে বাহাদুর শাহ জাফরকে মুঘল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে। সম্রাটকে তাঁরা এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ জানান। অবস্থার চাপে পড়ে তিনি রাজি হলেও কর্তৃত্ব থেকে গিয়েছিল সিপাইদের হাতে। যদিও সকল আদেশ-নির্দেশ তাঁর নামে, তাঁর সিল-মোহরসহ বেরিয়েছিল। সৈনিক ও মোঘলদের টানাপোড়নের মাঝে কয়েক মাসের মধ্যে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। ১৮৫৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ইংরেজরা দিল্লি পুনর্দখল করে এবং হাজার হাজার বিদ্রোহী সৈনিককে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে।
১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহে মেতে ওঠে এবং জেলখানা হতে সকল বন্দীদের মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নেয়। কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতীয় সমাজে যে জুলুম-নিপীড়ন চালায় তারই অনিবার্য প্রতিক্রিয়া ছিল এই ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ। যে বিদ্রোহের শুরুটা করেছিলেন মঙ্গল পান্ডে।
লেখনঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস(অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
শহীদ মঙ্গল পান্ডে"
শহীদ মঙ্গল পান্ডের জন্ম ১৯ জুলাই, ১৮২৭ আর মৃত্যু ৮ এপ্রিল, ১৮৫৭। তার আদি বাড়ি ছিল উত্তর প্রদেশের বালিয়া জেলার নাগওয়া গ্রামে।
ইংরেজ কোম্পানি সরকারের বিরোদ্ধে সিপাই বিদ্রোহ বা জাতীয় মহাবিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিল মঙ্গল পান্ডের হাত ধরে,কলকাতার উপকন্ঠে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ব্যারাকপুরে। সিপাইদের প্যারেড গ্রাউন্ডে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ইংরেজ বিরোধী অভ্যুত্থানের ডাক দেন সিপাই মঙ্গল। বিদ্রোহী মঙ্গলকে নিবৃত্ত করতে আসা দুই ইংরেজ অফিসার অ্যাডজুট্যান্ট লেফটেন্যান্ট বাগ এবং সার্জেন্ট মেজরকে প্রকাশ্যে হত্যা করে বিদ্রোহের সূচনা করেন। ইংরেজ বাহিনী কর্তৃক ঘেরাওয়ের পূর্বমুহূর্তে আত্মসমর্পনের বদলে বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল মঙ্গল পান্ডে, পরে গুলিবিদ্ধ মঙ্গল পান্ডেকে হসপিটালে ভর্তি করেন ইংরেজ সরকার। সুস্থ হওয়ার পর প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয় ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল। ইংরেজ অফিসারদের আদেশ অমান্য করা ও মঙ্গল পান্ডেকে নিবৃত্ত না করে সহযোগীতার অপরাধে অপর এক ভারতীয় সিপাই ঈশ্বরী প্রসাদ পান্ডেকে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ, রোববার অপরাহ্নে বারাকপুর সৈনিক নিবাসে ফাঁসি দেয় ইংরেজ সরকার।
কলকাতার ব্যারাকপুরে সিপাইদের প্যারেড গ্রাউন্ডে ইংরেজ বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রথম প্রকাশ্যে ডাক দিয়েছিলেন সিপাই মঙ্গল পান্ডে।
মঙ্গল পান্ডে প্যারেড গ্রাউন্ডের সমস্ত সেপাইদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, “ভাইসব, আর সময় নেই! যদি নিজেদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য, ধর্ম ফিরিঙ্গীর হাতে দলিত করতে না চাও তবে এগিয়ে এস। ধর কৃপাণ!”
“বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো ভাইসব। ফিরিঙ্গীর পায়ের তলায় আর কতদিন পড়ে থাকবে! ওরা আমাদের সোনার দেশ লুটেপুটে খাচ্ছে, আর আমরা না খেয়ে মরছি। ওরা আমাদের ধর্মের উপর হাত দিয়েছে, আমাদের জাতিভ্রষ্ট করছে। ভাইসব ফিরিঙ্গীদের মারো, একটা একটা করে সব ব্যাটাকে মারো; ফিরিঙ্গীদের খতম করে দেশকে স্বাধীন কর”।
মঙ্গল পাণ্ডে ব্যারাকপুরে এভাবেই সিপাহী বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। যে বিদ্রোহ খুব শীঘ্রই মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি এটা সারা বাংলাদেশ জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৫৭ সালের ১১ মে মিরাট থেকে তিনশ’ বিদ্রোহী সিপাই দিল্লি এসে ৪৯ জন ব্রিটিশ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে এবং দিল্লির দখল হাতে নিয়ে বাহাদুর শাহ জাফরকে মুঘল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে। সম্রাটকে তাঁরা এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ জানান। অবস্থার চাপে পড়ে তিনি রাজি হলেও কর্তৃত্ব থেকে গিয়েছিল সিপাইদের হাতে। যদিও সকল আদেশ-নির্দেশ তাঁর নামে, তাঁর সিল-মোহরসহ বেরিয়েছিল। সৈনিক ও মোঘলদের টানাপোড়নের মাঝে কয়েক মাসের মধ্যে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। ১৮৫৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ইংরেজরা দিল্লি পুনর্দখল করে এবং হাজার হাজার বিদ্রোহী সৈনিককে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে।
১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহে মেতে ওঠে এবং জেলখানা হতে সকল বন্দীদের মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নেয়। কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতীয় সমাজে যে জুলুম-নিপীড়ন চালায় তারই অনিবার্য প্রতিক্রিয়া ছিল এই ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ। যে বিদ্রোহের শুরুটা করেছিলেন মঙ্গল পান্ডে।
লেখনঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস(অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Sunday, May 5, 2019
বাংলাদেশে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজনঃ মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব কমানোর জন্য বাংলাদেশে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ লেবার পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি।
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া
সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ লেবার পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি।
Tuesday, April 9, 2019
শেষ বিকালের ডাক (মুহাম্মাদ মহসীন ভূঁইয়া)
শেষ বিকালের ডাক (
মুহাম্মাদ মহসীন ভূঁইয়া)
বৃহস্পতির বিকাল বেলা আমায় নিও বন্ধু।
তোমার প্রেমে পাগল হয়ে পাড়ি দিবো সিন্ধু।
রক্তমাখা জামা গায়ে আসবো সেদিন কাছে।
আপন যারা পালিয়ে যাবে তুমি থাকবে পাশে।
চোখের জ্যোতির বন্ধ হবে থাকবে নাকো আলো।
আলোর ভরা ভুবন সেদিন আমার হবে কালো।
শেষ গোধূলির লাল শাড়িটি পড়বে আকাশ জানি।
এই পৃথিবী মরিচিকা তুমি সত্যের স্বামী।
গোসল শেষ সাজবো আমি উঠবে সেদিন খাটে
শুক্রবারের প্রভাত শেষে রাখবে নদীর ঘাটে
পাগল তোমার সব হারিয়ে আসবো সেদিন ফিরে।
ক্ষমা করে আদর মেখে নিও জ্যোতি ঘিরে।
মাটির নূরে মাটি ঘুরে আসছি মাটির ঘরে।
এই মাটিতে তুলবে আবার প্রলয়ে ঘুর্ণীর পরে।
জীবন আমার তোমায় ভুলে কাটছি হেলার ছলে।
রক্ষা করো মহান প্রভু দয়ার সাগর হলে।
মুহাম্মাদ মহসীন ভূঁইয়া)
বৃহস্পতির বিকাল বেলা আমায় নিও বন্ধু।
তোমার প্রেমে পাগল হয়ে পাড়ি দিবো সিন্ধু।
রক্তমাখা জামা গায়ে আসবো সেদিন কাছে।
আপন যারা পালিয়ে যাবে তুমি থাকবে পাশে।
চোখের জ্যোতির বন্ধ হবে থাকবে নাকো আলো।
আলোর ভরা ভুবন সেদিন আমার হবে কালো।
শেষ গোধূলির লাল শাড়িটি পড়বে আকাশ জানি।
এই পৃথিবী মরিচিকা তুমি সত্যের স্বামী।
গোসল শেষ সাজবো আমি উঠবে সেদিন খাটে
শুক্রবারের প্রভাত শেষে রাখবে নদীর ঘাটে
পাগল তোমার সব হারিয়ে আসবো সেদিন ফিরে।
ক্ষমা করে আদর মেখে নিও জ্যোতি ঘিরে।
মাটির নূরে মাটি ঘুরে আসছি মাটির ঘরে।
এই মাটিতে তুলবে আবার প্রলয়ে ঘুর্ণীর পরে।
জীবন আমার তোমায় ভুলে কাটছি হেলার ছলে।
রক্ষা করো মহান প্রভু দয়ার সাগর হলে।
Friday, April 5, 2019
হিংস্রতা অমানুষের রুপ
মানুষ এমন একটি প্রাণী বা জীব, যার মান ও হুশ রয়েছে। আকারে পরিবর্তনশীল প্রতিটি বস্তুর জীবন আছে, তবে সকল জীবনের মান ও হুশ নেই। যাদের মান আর হুশ আছে তাদেরকে সমাজে মানুষ বলে। আজকাল আবার কিছু কিছু মানুষের ভিতরে অমানুষের আত্মা ভরকরে আছে, আকার ও আওয়াজে মানুষের মত হলেও,এরা আসলে মানুষ নয়। এদের চেতনা শক্তি কম, ন্যায় ও অন্যায় এর মাঝে পার্থক্য বুঝেনা। সত্য মিথ্যার ব্যবধান করেনা, নিজেদের পক্ষে হলে হাসে আর বিপক্ষে গেলে গলা উছিয়ে কাশে। অনেকে আবার অতি বুদ্ধির ডেকোর তুলে অতি প্রগতিশীলতা অভিনয় করে। মানুষকে বিচার করে ধর্ম,বর্ণ,জাতির ও নীতির পরিচয়ে। সমাজ ব্যবস্থায় আজকাল এমন মানুষের অবস্থান ব্যাপক উন্নত স্তরে।রাষ্ট্রের উপর তলা থেকে নীচ তলায় এখন মান ও হুশ বিহীন অভিনেতা মানুষের সংখ্যায়ই বেশি। মানুষের মানবিকতা অমানুষের স্তরে চলে এসেছে। নিজের প্রয়োজনে একজন অন্যজনকে দাসের মত ভাবতে লজ্জাবোধ করেনা। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতে চায়না। জীবনের ধ্যান জ্ঞান নিজেকে নিয়ে, নিজের ভোগ ও সুখ নিয়ে। আত্মসুখ ও মনের শান্তির জন্য জগৎ জ্বালিয়েও এদের ভোগ মিঠেনা। আজকাল মানুষের বাহ্যিক রুপের সাথে শিকারি সিংহ ও হিংস্র হায়নার মানসিকতা যুক্ত হয়ে এক নতুন মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। এককথায় বলতে পারেন, শিকারি পশুরমত হিংস্র মানুষ। কাক কাকের মাংস না খেলেও, মানুষ কিন্তু ঠিকই মানুষের মাংস খায়। এরা কুপিয়ে কুপিয়ে খায়, পিটিয়ে পিটিয়ে খায়, পায়ের তলা দিয়ে পিষ্টে মানুষ মেরে খায়, হাতুরি দিয়ে চেঁচে চেঁচে নিজ বন্ধুর মাংসও খায়। নীতির পার্থক্য বা ধর্মের পার্থক্যের জন্য মানুষ নিজ প্রজাতিকে হত্যা করে খায়। দল বা আদর্শের জন্য একজন অন্যজনকে প্রকাশ্যে হত্যা করে নৃত্য করছে আর ধ্বংস করছে মানবতা ও মানসিকতাকে। আদর্শ, ধর্মীয় তকমা ও প্রগতির চেতনায় মানুষ হত্যা এখন স্বাভাবিক ও আইন সংগত ব্যাপার হয়ে গেছে। কেউ ক্ষমতায় থাকার জন্য মানুষের পোড়া মাংস খায়, আবার কেউ ক্ষমতায় আসার জন্য পোড়া মাংসের কাবাব খায়। স্বর্গ পাওয়ার আশায় মানুষ মানুষকে মেরে, মানুষকে কথার আঘাত দিয়ে সুখ পায় আবার কেউ কেউ স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি পেতে মানুষের উপর বোমা মারে। জগতের আধুনিক রুপ তৈরি করতে এক মানুষ অন্য মানুষকে দাস বানিয়ে কাজ আদায় করছে। আধুনিক সভ্যতার ইমারত গুলোকে আজ রক্ত মাংসের ইমারত মনে হয়। এক সভ্যতার স্থায়িত্বের জন্য অন্য সভ্যতাকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিচ্ছে এজগতের অসভ্য ও মাংস লোভী হিংস্র মানুষ গুলো। এখন মানুষ হিংস্র জানোয়ার থেকে নিরাপদ হলেও, অতি আধুনিক প্রগতিশীল হিংস্র মানুষ থেকে নিরাপদ নয়। সমস্ত পৃথিবীকে এরা নিজ সুখ ও শান্তির জন্য খোদার নরক বানাচ্ছে। বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে শান্তির নিরাপদ শহরকে। এসব অমানুষদের বিষক্রিয়া এত মারাত্মক যে, আকাশ-বাতাস বিষের আগুনে জ্বলছে। এদের নীতি আদর্শ বা ব্যবস্থার বিরোদ্ধে কথা বললে, আপনাকে শুয়রের পালের মত আক্রমণ করবে। প্রয়োজনে আপনাকে থামাতে গুম,খুন বা হত্যার পথে নামবে। এরা নিজের পথ ও মতের জন্য অন্যের বুকে চুরি চালায়। আজ সমাজ রাষ্ট্র বা বিশ্বে এদের হিংস্রতার জোয়ার বইছে। এদের হাত থেকে আমি, আপনি, আমরা বা আমাদের জীবন নিরাপদ নয়। এদের প্রগতি বা ধর্মীয় উন্মাদনায় ৭১ সালে গণহত্যা, ৭২ ও ৭৩ এর গুপ্ত হত্যা, ৭৫ এর কালো হত্যা, জেলহত্যা, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের হত্যা, বিডিআর হত্যা, জঙ্গিবাহিনী বোমা হামলা, শাপলা চত্তরের হত্যা ও ২৮ অক্টোবরের প্রকাশ্যে মানুষ হত্যাসহ রাজনীতির নামে বিনাবিচারে মানুষ হত্যা আজ সুস্থ সমাজকে অসুস্থ সমাজে পরিনত করেছে। এদের বাহিরের রুপ মানুষের আর ভিতরের রুপ জানোয়ারের।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mohsinbhuiyan1980@gmail.com
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mohsinbhuiyan1980@gmail.com
Thursday, April 4, 2019
৭১ পরাজিতরা আবারও দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে
৭১ পরাজিতরা আবারও দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছেঃ (মহসীন ভূঁইয়া)
জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ লেবার পার্টি আয়োজিত "সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনীতিকদের করণীয়" শীর্ষক আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লেবার পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মহসীন ভূঁইয়া বলেন, গত ৩০ তারিখ নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে এদেশের ষোলো কোটি মানুষ ৭১ পরাজিতদের প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ এখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির সাথে আছে। উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের পক্ষে মানুষ রায় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মাদক আর সন্ত্রাসের বিরোদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের সবাইকে দেশপ্রেমিক হতে হবে এবং মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে সরকারের পাশে থাকতে হবে কারণ ৭১ পরাজিতরা আবারও দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদীর সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি, যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট ডাঃ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
আরো বক্তব্য রাখেন বিএলডিপির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, বিকল্প ধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এম পি ও চাকসু ভিপি শাহ মাজহারুল হক চৌধুরী, বিকল্প ধারার ভাইস চেয়ারম্যান এনায়েত কবির, বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া,জন দলের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জয় চৌধুরী,বাগসদ সভাপতি সরদার শামস আল মামুন,ইসলামী গণতন্ত্র পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, লেবার পার্টির নেতা সুরুজ্জামান, রাজু আহমেদ পোদ্দার, জিয়াউর রহমান, কামরুল ইসলাম সুরুজ প্রমুখ।
জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ লেবার পার্টি আয়োজিত "সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনীতিকদের করণীয়" শীর্ষক আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লেবার পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মহসীন ভূঁইয়া বলেন, গত ৩০ তারিখ নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে এদেশের ষোলো কোটি মানুষ ৭১ পরাজিতদের প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ এখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির সাথে আছে। উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের পক্ষে মানুষ রায় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মাদক আর সন্ত্রাসের বিরোদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের সবাইকে দেশপ্রেমিক হতে হবে এবং মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে সরকারের পাশে থাকতে হবে কারণ ৭১ পরাজিতরা আবারও দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদীর সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি, যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট ডাঃ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
আরো বক্তব্য রাখেন বিএলডিপির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, বিকল্প ধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এম পি ও চাকসু ভিপি শাহ মাজহারুল হক চৌধুরী, বিকল্প ধারার ভাইস চেয়ারম্যান এনায়েত কবির, বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া,জন দলের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জয় চৌধুরী,বাগসদ সভাপতি সরদার শামস আল মামুন,ইসলামী গণতন্ত্র পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, লেবার পার্টির নেতা সুরুজ্জামান, রাজু আহমেদ পোদ্দার, জিয়াউর রহমান, কামরুল ইসলাম সুরুজ প্রমুখ।
Friday, March 29, 2019
পার্বত্য অঞ্চল ও শান্তিচুক্তিঃ মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
আমি অনেক দিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিষয় লিখবো বলে ভাবছিলাম, কিছুদিন আগে এবিষয় সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা পোস্ট দেওয়ার পর অনেক পাঠক আমাকে বিভিন্ন বিষয় পরামর্শ ও সহযোগীতা করেছে, তাই প্রথমে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজ যে বিষয়টি নিয়ে লিখতেছি, এটা বাংলাদেশের সামাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে জড়িত। তাই প্রথমে ঐ এলাকাটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং বসবাসরত জনগোষ্ঠীর আগমনের কিছুটা চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপদটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি পাহাড় ও বনভূমি এলাকা। এখানের তিনটি জেলা রাঙামাটি , খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পার্বত্য অঞ্চল। চট্টগ্রাম বিভাগের এই এলাকা পাহাড়, বনভূমি ও উপত্যকায় পূর্ণ বলে এর নামকরণ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের আয়তনের এক দশমাংশ এই পার্বত্য এলাকা। মোট বনভূমির বিশাল অংশের এই অঞ্চল জুড়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে বয়ে চলা প্রধান নদী হল কর্ণফুলী । আর এই নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাইতে উৎপাদন হচ্ছে জলবিদ্যুৎ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনপদটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি পাহাড় ও বনভূমি এলাকা। এখানের তিনটি জেলা রাঙামাটি , খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পার্বত্য অঞ্চল। চট্টগ্রাম বিভাগের এই এলাকা পাহাড়, বনভূমি ও উপত্যকায় পূর্ণ বলে এর নামকরণ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের আয়তনের এক দশমাংশ এই পার্বত্য এলাকা। মোট বনভূমির বিশাল অংশের এই অঞ্চল জুড়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে বয়ে চলা প্রধান নদী হল কর্ণফুলী । আর এই নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাইতে উৎপাদন হচ্ছে জলবিদ্যুৎ।
এই অঞ্চলটিতে প্রধানত বসবাস করেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সাইনো তিব্বতী মঙ্গোলয়ড ১৪ টি জাতিগোষ্ঠী, এরা বিভিন্ন কারণ ও গঠনার পরিক্রমায় এই অঞ্চলটিতে এসে বসবাস শুরু করেছেন। প্রায় ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ)জনসংখ্যার অভিবাসী উপজাতি প্রধান দু'টি হলো চাকমা ও মারমা উপজাতি। এছাড়াও আছে ত্রিপুরা তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই, পাংখো, ম্রো, খিয়াং, বম,খুমি, চাক,গুর্খা, আসাম,সানতাল, এবং বিপুল সংখ্যক বহিরাগত বা স্যাটেলার বাঙ্গালী।
পার্বত্য অঞ্চলটি ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা এই অঞ্চল অধিকার করে শাসন করেছিলেন, ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এই এলাকা দখল করে নিজ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা এই এলাকা পুনর্দখল করেন, এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রেখে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল সম্রাজ্যের অধীনে ১৬৬৬ হতে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সুবা বাংলার শাসন ছিল। ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ড বা ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেন। ১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরাই প্রথম এই এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা হলে এই এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জেলা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮০ এর দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলা - রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি নামে বিভক্ত করা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলটি ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা এই অঞ্চল অধিকার করে শাসন করেছিলেন, ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এই এলাকা দখল করে নিজ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা এই এলাকা পুনর্দখল করেন, এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রেখে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল সম্রাজ্যের অধীনে ১৬৬৬ হতে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সুবা বাংলার শাসন ছিল। ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ড বা ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেন। ১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরাই প্রথম এই এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা হলে এই এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জেলা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮০ এর দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলা - রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি নামে বিভক্ত করা হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পর এই অঞ্চলে কিছু পাহাড়ি উপজাতি সংগঠন বিভিন্ন দাবী নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তার মধ্যে কিছু কিছু প্রকাশ্যে পাহাড়িদের জন্য কাজ করে আবার কিছু সংগঠন গোপনে কাজ করেছে। তবে এসব সংগঠনের কর্মকান্ড বেশি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ১৯৭৩ প্রতিষ্ঠিত হয়। (জে এস এস) হলো বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি গোষ্ঠির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতির অধিকারের জন্য লড়াই করে আসছে। ১৯৭৫ সালে এই দলটি নিজেদের গোপন সামরিক শাখা (শান্তিবাহিনী) প্রতিষ্ঠা করেন, এবং এরপর থেকে নিজেদের অধিকার আদায়ের ব্যানারে সরকারি বাহিনী ও বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের সাথে লড়াই করে আসছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত প্রায় ২২ বছর এই বাহিনীর সাথে সরকারে বিভিন্ন বাহিনী ও সেটেলার ভাঙ্গালীদের অনেক বার রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়ছে। এসব সংঘাত সংঘর্ষের জন্য প্রধানত দায়ি সরকারের দু'টি নীতি, এক- হঠাৎ করে সরকার বিভিন্ন স্হান থেকে ভাসমান অতি সাধারন নাগরিক ও শহরের বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের বাঙ্গালী নাগরিকদের রাতে আঁধারে এনে পার্বত্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে দেন। দুই- ঐ অঞ্চলের পাহাড়ি ও সেটেলার ভাঙ্গালিদের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে দিয়েছিল। এছাড়া আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সরকার একচেটিয়া ভাবে পাহাড়িদের সাহায্যের নামে সামরিক সমর্থন দিয়ে উস্কানি দিয়েছিল এবং বাংলাদেশে ভুমিকে দিখন্ডিত করে দুর্বল রাষ্ট্রে বানাতে চেয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সরকার নিজ ভুখন্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, অতিতের নেওয়া পদক্ষেপ থেকে ফিরে এসে পাহাড়ি ও বাঙ্গালির মাঝে সংঘর্ষ বন্ধের লক্ষ্যে, সরকার ও উপজাতিয় পাহাড়ি সংগঠন (জে এস এস) একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেন। যে চুক্তির মূলত শান্তি বাহিনীকে নিরস্ত্রীকরন ও জে.এস.এসকে রাজনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য হয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আর এই চুক্তিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে শান্তিচুক্তি বলা হয়।
এছাড়াও ১৯৭৩ সালে আগে অর্থাৎ জেএসএস সৃষ্টির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ছাত্রদের সংগঠন ছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় কল্যাণ সমিতি যা ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আমলে-এ সংগঠিত হয়েছিল। রাঙামাটিতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের ফলে অনেক অধিবাসী বাস্তুচ্যুত বা ভিটে মাটি হারা হয়েছেন, যাদের পক্ষে সেসময় সংগঠনটি প্রায় ১০০০০০ মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে। পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা যেমন, চাকমা রাজনীতিবীদ চারু বিকাশ চাকমা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এ অঞ্চলের মানুষের স্বায়ত্তশাসন এবং আদিবাসী স্বীকৃতির অধিকার দাবি করেন। লারমা ও অন্যান্য প্রতিবাদকারীরা বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়ার প্রতিবাদ করে যদিও সংবিধানে জাতিগত পরিচয় স্বীকৃত ছিল কিন্তু তারা বাংলাদেশ থেকে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ও বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের নীতি অনুযায়ী, বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা একমাত্র স্বীকৃত এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলেই বাঙালি (পরে বাংলাদেশি) নামে পরিচিত। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে একটি পার্বত্য প্রতিনিধি দল দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করতে যান এবং শেখ মুজিব পার্বত্য জাতিগোষ্ঠীর বাঙালি পরিচয় গ্রহণের উপর জোড় দেন। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐ অঞ্চলের স্থানীয়দের দ্বারা বিদ্রোহ হওয়ার আশংঙ্কায় সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি বসতি স্থাপন করে স্থানীয়দের সংখ্যা হ্রাস করতে চেয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় পরে জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকার একই ভাবে ঐ অঞ্চলটিকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাসমান ভাঙ্গালি নাগরিকদের পার্বত্য এলাকায় সেটেল করেন এবং সরকারি বাহিনীর ও সেটেলার বাঙ্গালিরা যৌথভাবে পাহাড়ি বিদ্রোহীদের দমনের নামে সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। ১৯৯৭ সালের পূর্বে এই এলাকার চিত্র ছিল খুবই ভয়াবহ ও নাজুক। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে জে এস এস সহ পাহাড়ি বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তি করেন। যদিও ততকালিন বিরোধী দল বিএনপিসহ জামায়ত এবং পার্বত্য ভাঙ্গালীদের কিছু সংগঠন এই চুক্তির বিরোধীতা করেন। তবে এদেশের বেশিরভাগ জনগণ বহিবিশ্ব এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকার এই ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি করার কারণে আজ প্রায় ২১ বছর পার্বত্য এলাকায় একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। যদিও স্বাধীনতা পরবর্তী ২১ টি বছর বাংলাদেশের এক দশমাংশ এলাকা পার্বত্য অঞ্চল ছিল নরকের মত। সাধারণ নাগরিকেরা ছিল শান্তিবাহিনী ও বাঙ্গালী সেটেলার বাহিনীর কাছে জিম্মি। জ্বালাও পোড়াও আর হত্যা ছিল একটি নিয়মিত কর্মকান্ডের মত। ১৯৯৭ এর আগে পাহাড়ি উপজাতি ও বহিরাগত সেটেলার ভাঙ্গালী একে অপরকে শত্রু মনে করতো, রাতের আধারে হামলা পাল্টা হামলা ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। সংবাদ মাধ্যম, বিদেশী সংস্থা ও পর্যটক শূন্য ছিল পার্বত্য অঞ্চল। ব্যবসা বাণিজ্য পিছিয়ে ছিল অঞ্চলটি।সরকার আর উপজাতিদের মাঝে বিশ্বাসের ছিল ব্যাপক ফারাক। এই জন্য একদিকে দায়ী ছিল, কিছু অতি উৎসাহি বিদ্রোহী উপজাতীয় সংগঠন এবং অপর দিকে সরকার অবিশ্বাস নীতির জন্য সেখানে ভাসমান বাঙ্গালীদের এনে বসতি স্থাপন করেছিল। বিদ্রোহীদের দমনের নামে সরকারি বাহিনীর দমন নিপীড়ন আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন জনপদ অনেকাংশেই পিছিয়ে পড়ে।পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অযাচিত উস্কানি মুলক ইন্ধন ও সাময়িক অস্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগীতা করে যুদ্ধ বাধাতে চেয়েছিল এবং ১৯৯৭ সালের আগে তারা অনেকটা সফলও বলা যায়। আমাদের প্রতিবেশীরা চেয়েছিল, ১৯৭১ অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে আবারও ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হোক। অবশ্যই তারা ১৯৯৭ এর চুক্তির পর সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ, এবং ভবিষ্যতে ও সফল হবেনা(ইনশাআল্লাহ)।
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস(অনার্স)এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বিএসএস(অনার্স)এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Thursday, March 28, 2019
ধর্ম চিন্তাঃ মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
• ধর্ম চিন্তাঃ
(মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া)
মানুষের বিশ্বাস, মানুষ নিজের উপর যেই নিয়ম বা বিধান নিজে নিজে আরোপ করে, অর্থাৎ অন্যের বল প্রয়োগ বা প্ররোচনায় প্ররোচিত না হয়ে স্বেচ্ছায় নিজে উপর নিজে যে লিখিত বা অলিখিত নীতিমালা কায়েম করে তাকে ধর্ম বলে। কোন ব্যক্তি যখন নিজের উপর ইসলামের বিধানে স্বেচ্ছায় কায়েম করে, তখন সে একজন ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয় এবং তার ধর্মীয় পরিচয় হয় মুসলিম। আবার কেউ যদি হিন্দু মত মেনে নেয়, তখন সে একজন হিন্দু ধর্মীয় অনুসারী হয়। অর্থাৎ এই মেনে নেওয়াটা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় হতে হবে। আজকের পৃথিবীতে এভাবেই ইসলাম, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, ঈসায়ীসহ শত শত মতবাদ বা বিশ্বাস মানুষ পালন করে। আবার একদল বিশ্বাসী আছে, যারা কোন নিয়ম বা বিধান কে মেনে চলতে চায়না। এরা হলো অবিশ্বাসী মতবাদে বিশ্বাসী, এটাকেও আপনি একটা বিধান বা ধর্ম বলতে পারেন। যারা কোন নিদিষ্ট নিয়মে বিশ্বাসী নয়। তাহলে আমরা বলতে পারি-
ধর্ম হলো মানুষের স্বেচ্ছায় নিয়মের বিধানে বন্দি এমন এক জীবন ব্যবস্থা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজেকে অন্য শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে দেয়। আর যারা আত্মসমর্পণ করেনা, তারা হলো অবিশ্বাসী ধর্মীয় বিধানে বিশ্বাসী। যেহেতু প্রত্যেক মানুষ কোন না কোন একটি নিয়ম বা বিধানে বিশ্বাসী, তাই সকল মানুষ আস্তিক ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী , মানুষ নাস্তিক হতে পারেনা। তবে কেউ ইসলামে আস্তিক, কেউ হিন্দুতে আস্তিক আবার কেউ বৌদ্ধ বা ঈসায়ী বা জৈনতে আস্তিক। কেউ স্রষ্টায় আস্তিক অথবা কেউ স্রষ্টায়হীনতায় আস্তিক।
মানুষ আত্মশুদ্ধি ও আত্মমুক্তির জন্য দুনিয়ার জীবনে যে পথ অনুসরণ করে চলে তাকে ধর্ম বলে। যে যেপথে বিশ্বাস করে, সে সেই ধর্ম পথের বিশ্বাসী বা অনুসারী। মানুষ ধর্মমত বা পথ পালন করার একমাত্র কারণ হলো আত্মশুদ্ধি বা আত্মমুক্তি। ধর্ম কখনও অসৎপথ বা মতে মানুষকে পরিচালিত করেনা। সকল ধর্মের মানুষ চায় মুক্তি,শান্তি ও শৃংখলা। ধর্ম চিন্তায় মানুষ হলো সত্যের অনুসন্ধানী ও সত্য প্রাপ্তি পথিক মাত্র। এখানে হিংসা, হানাহানি, হত্যা ও জোর জুলুমের স্থান নেই। ধর্ম কখনও মানুষকে অমানবিক আচরণ শিক্ষা দেয়না। ধর্মের শিক্ষা হলো মানবতা, শান্তি, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সহাবস্থান, জীবে প্রেম, অহিংসা আর সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্যের সন্ধান করা।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহাসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস অর্থনীতি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
(মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া)
মানুষের বিশ্বাস, মানুষ নিজের উপর যেই নিয়ম বা বিধান নিজে নিজে আরোপ করে, অর্থাৎ অন্যের বল প্রয়োগ বা প্ররোচনায় প্ররোচিত না হয়ে স্বেচ্ছায় নিজে উপর নিজে যে লিখিত বা অলিখিত নীতিমালা কায়েম করে তাকে ধর্ম বলে। কোন ব্যক্তি যখন নিজের উপর ইসলামের বিধানে স্বেচ্ছায় কায়েম করে, তখন সে একজন ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয় এবং তার ধর্মীয় পরিচয় হয় মুসলিম। আবার কেউ যদি হিন্দু মত মেনে নেয়, তখন সে একজন হিন্দু ধর্মীয় অনুসারী হয়। অর্থাৎ এই মেনে নেওয়াটা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় হতে হবে। আজকের পৃথিবীতে এভাবেই ইসলাম, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, ঈসায়ীসহ শত শত মতবাদ বা বিশ্বাস মানুষ পালন করে। আবার একদল বিশ্বাসী আছে, যারা কোন নিয়ম বা বিধান কে মেনে চলতে চায়না। এরা হলো অবিশ্বাসী মতবাদে বিশ্বাসী, এটাকেও আপনি একটা বিধান বা ধর্ম বলতে পারেন। যারা কোন নিদিষ্ট নিয়মে বিশ্বাসী নয়। তাহলে আমরা বলতে পারি-
ধর্ম হলো মানুষের স্বেচ্ছায় নিয়মের বিধানে বন্দি এমন এক জীবন ব্যবস্থা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজেকে অন্য শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে দেয়। আর যারা আত্মসমর্পণ করেনা, তারা হলো অবিশ্বাসী ধর্মীয় বিধানে বিশ্বাসী। যেহেতু প্রত্যেক মানুষ কোন না কোন একটি নিয়ম বা বিধানে বিশ্বাসী, তাই সকল মানুষ আস্তিক ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী , মানুষ নাস্তিক হতে পারেনা। তবে কেউ ইসলামে আস্তিক, কেউ হিন্দুতে আস্তিক আবার কেউ বৌদ্ধ বা ঈসায়ী বা জৈনতে আস্তিক। কেউ স্রষ্টায় আস্তিক অথবা কেউ স্রষ্টায়হীনতায় আস্তিক।
মানুষ আত্মশুদ্ধি ও আত্মমুক্তির জন্য দুনিয়ার জীবনে যে পথ অনুসরণ করে চলে তাকে ধর্ম বলে। যে যেপথে বিশ্বাস করে, সে সেই ধর্ম পথের বিশ্বাসী বা অনুসারী। মানুষ ধর্মমত বা পথ পালন করার একমাত্র কারণ হলো আত্মশুদ্ধি বা আত্মমুক্তি। ধর্ম কখনও অসৎপথ বা মতে মানুষকে পরিচালিত করেনা। সকল ধর্মের মানুষ চায় মুক্তি,শান্তি ও শৃংখলা। ধর্ম চিন্তায় মানুষ হলো সত্যের অনুসন্ধানী ও সত্য প্রাপ্তি পথিক মাত্র। এখানে হিংসা, হানাহানি, হত্যা ও জোর জুলুমের স্থান নেই। ধর্ম কখনও মানুষকে অমানবিক আচরণ শিক্ষা দেয়না। ধর্মের শিক্ষা হলো মানবতা, শান্তি, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সহাবস্থান, জীবে প্রেম, অহিংসা আর সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্যের সন্ধান করা।
লেখকঃ
মুহাম্মদ মহাসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস অর্থনীতি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Wednesday, March 6, 2019
বাড়িওয়ালা
বাড়িওয়ালা
বাড়িওয়ালার কান্ড
নামায পড়ে রোজা রাখে
আসলে সে ভন্ড।
নীতিহীন ভ্রষ্ট লোক
অতি স্বার্থবাজ,
ভাড়াটিয়া কষ্ট দেওয়া
এই লোকের কাজ।
বাসাটি যেমন তেমন
ভাড়া দ্বিগুণ,
টাকা দিতে হলে দেরি
জ্বলে বেগুন।
গ্যাসহীন বাসায় থাকি
বিদুৎ চমৎকার,
বছর শেষ নাহতে
ভাড়া বাড়ানোর পুরষ্কার।
Subscribe to:
Posts (Atom)










