Thursday, October 11, 2018

বাংলাদেশ লেবার পার্টির নির্বাচনি ইশতেহার-২০১৮

     "দুর্নীতি দুঃশাসন করবো শেষ
      গড়বো নিরাপদ বাংলাদেশ"

চেতনায় ৭১ বুকে ধারন করে সম্পূর্ণ দুর্নীতি, দারিদ্র ও বেকারত্ব মুক্তি দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে, এদেশকে আধুনিক  প্রযুক্তিনির্ভর কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন, ন্যায় ও সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের  লক্ষ্যে- ১৫ বছরের মাস্টার পরিকল্পনা (মেগা পরিকল্পনা) হাতে নিয়ে  (৭১-দফা)  নির্বাচনি ইশতেহার -

১। সম্পূর্ণ দুর্নীতি মুক্ত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র  গঠনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।

২।  অদক্ষ নাগরিকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে সকল কর্মক্ষম নাগরিকদের দেশে বা বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করা হবে এবং দক্ষ বেকারদের বেকার ভাতা প্রদান করা হবে।

৩। এইচ এস সি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে - আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা,ব্যবসা শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত বাধ্যতা মূলক  করা হবে।

৪।রাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা  যাবেনা।

৫।  কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে খাদ্য উৎপাদ বৃদ্ধি করা হবে ও নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হবে এবং খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ গঠনের লক্ষ্যে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।

৬। নাগরিকদের মৌলিক চিকিৎসার অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরোদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৭।  রাষ্ট্রীয় খরচে কোন নাগরিকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবেনা বা চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবেনা।

৮। ভূমিহীন ও স্বল্প আয়ের নাগরিকদের জন্য  সুদবিহীন ঋণের মাধ্যমে গৃহঋণ প্রকল্প চালু করা হবে।

৯। মাদক মুক্তি দেশ গঠনের লক্ষ্যে, মাদক দ্রব্যের ব্যবহার আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে (তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তারের অনুমতিতে ব্যবহার করা যাবে) এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের চাকুরী প্রদান করা হবেনা।

১০। সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের সময় এবং চাকুরীজীবনে ৫ বছর পরপর ড্রাগ টেস্ট দিতে হবে।

১১। সাময়িক ব্যয় কমানো লক্ষ্যে এবং প্রতিটি নাগরিককে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ সবল করে গড়ে তোলার জন্য (৩ মাসের) সাময়িক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

১২। বাল্য বিয়ে বন্ধ, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে কার্যকর আইন প্রণয়ন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে প্রচারণা বৃদ্ধি এবং যৌতুক বিহীন বিয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সুদ মুক্ত মেয়াদী ঋণ দেওয়া হবে।

১৩। শিক্ষিত বেকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সল্প সুদে ৫ লক্ষ টাকা কৃষি বা ক্ষুদ্র শিল্প ঋণ দেওয়া হবে।

১৪। জন্মের সময় মা ও তার পরিবারের সচেতনতা মুলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রথম সন্তান জন্মের সকল ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে।

১৫। সকল নাগরিকের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং মতা প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ধর্মহীনদের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার থাকবে।

১৬। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিষিদ্ধ করা হবে এবং রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে সমান সুযোগ সুবিধা ও অধিকার বজায় থাকবে।

১৭। দেশের সকল নাগরিক বা দল বা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় দিবস গুলো মর্যাদার সাথে পালন করতে হবে এবং জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানাতে হবে।

১৮। উম্মুক্ত সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অনুমোদন নিতে হবে।

১৯।  রাত ১১টার পর দেশের জাতীয় অনুষ্ঠান ছাড়া শব্দ দোষণ  করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান করা যাবেনা।

২০। রাষ্ট্রের কাছে নারী বা পুরুষ বা তৃতীয় লিংগের সবাই নাগরিক এবং বাংলাদেশি বলেই পরিচিত হবে।

২১। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী বা শারীরিক অক্ষম বিশেষ শ্রেনীর জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজনে বিশেষ সুবিধা দিবে।

২২। সন্তান বা সম্পদহীন বয়স্ক নাগরিকদের (আদালতের রায়ে শাস্তি প্রাপ্তরা ছাড়া) বিশেষ ভাতা ও চিকিৎসা ব্যয় সরকারী ভাবে বহন করা হবে।

২৩। কর্মক্ষম প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার জন্য সরকারি ভাবে (মাসিক একশত টাকা হারে) ৫ লক্ষ টাকার জীবন বীমা চালু করা হবে।

২৪। আয়ক্ষম প্রতিটি নাগরিককে আয়করের আওতায় নিয়ে আসা হবে এবং বিশেষ কর কার্ড দিয়ে উৎসাহিত করা হবে।

২৫। প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং জেলা ভিত্তিক উচ্চ শিক্ষার জন্য মেধা ও গরীব ছাত্রদের জন্য উচ্চ শিক্ষা বৃত্তি চালু করা হবে।

২৬। রাষ্ট্রের অধিনে পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ সরকারী করা হবে এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ২০ ভাগ গরীব ছাত্রদের বিনা বেতনে অধ্যায়ন ও ২০ ভাগ সিট গ্রামের ছাত্রদের জন্য থাকতে হবে।

২৭। মুক্তিযোদ্ধা, যোদ্ধাহত ও বীরাঙ্গনা মায়েদের জন্য সরকারি যানবাহন ও চিকিৎসা ব্যয় সম্পূর্ণ ফ্রী থাকবে এবং বেসরকারি যানবাহন ও চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেক বা হাপ করা হবে।

২৮। পররাষ্ট্র নীতি হবে সকল দেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, বন্ধুর সাথে বন্ধুর বিরোধ হলে আপোষ করা বা নিরপেক্ষ থাকা।

২৯। আইন, বিচার, শাসন ও নির্বাচন কমিশন  কে শতভাগ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়া হবে। এবং রাষ্ট্র কোন ধরনের বিশেষ সুবিধা নিবেনা।

৩০। ১৫ বছরের পরিকল্পনায় শতভাগ স্বাক্ষরতার হার অর্জন করা হবে। আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে এবং এদেশকে শিক্ষাবান্ধব দেশ হিসেবে গড়েতোলা হবে।

৩১। দলীয় বা রাষ্ট্রীয় পদে একজন নাগরিক  তিনবারের অধিক থাকতে বা নির্বাচন করতে পারবেনা।

৩২। সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ক্ষেত্রে, চাকুরী প্রার্থী থেকে আবেদনের সাথে কোন ধরনের অর্থ গ্রহণ করা যাবেনা এবং সরকারি চাকুরীর ক্ষেত্রে একবারের অধিক কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করা যাবেনা

৩৩। সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়স সকল নাগরিকের জন্য ৪০ বছর করা হবে এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য ৪২ বছর করা হবে।

৩৪। বিশেষ শ্রেনীর নাগরিক ছাড়া, সরকারি ও বেসরকারি সকল নিয়োগ সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে হবে, তবে বিশেষ প্রয়োজনে নারী ও পুরুষের কোটা থাকবে।

৩৫। সাময়িক বাহিনীকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে এবং নারীদের অংশ গ্রহণ বৃদ্ধি করা হবে।

৩৬। দেশ রক্ষার প্রয়োজনে বিশেষ প্রস্তুতি বৃদ্ধি করা হবে এবং সমসাময়িক আধুনিক বা অত্যাধুনিক অস্ত্রবল ও জনবল তৈরি করা হবে।

৩৭। সরকারি কর্মচারীদের প্রতিবছর সম্পদের হিসাব নিজ বিভাগে জমা দিতে হবে। সম্পদের হিসেবে অতিরিক্ত ব্যবধান হলে দুর্নীতি কমিশনের আওতায় এনে বিশেষ বিভাগে বিচার করা হবে।

৩৮। সরকারি চাকুরী শেষ হওয়ার ৫ বছর ব্যবধানের আগে কোন ধরনের নির্বাচন করতে পারবেনা এবং ২ বছর ব্যবধানের আগে রাষ্ট্রের অন্য কোন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেনা।

৩৯।রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ স্পীকার, প্রধান বিচারপতি ও প্রধান বিরোধীদলের নেতা ছাড়া অন্য কাউকে পুলিশ প্রটোকল দেওয়া হবেনা, তবে বিশেষ প্রয়োজনে নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিতে পারবেন।

৪০। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য ৫ বছর মেয়াদের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়ক করা হবে এবং ট্রাফিক গার্ড বাহিনী নামে একটি আলাদা বাহিনী গঠন ও এই বাহিনীর জন্য আলাদা মন্ত্রনালয় করা হবে।

৪১। নিয়োগ বিভাগ বা কর্ম বিভাগ নামে আলাদা একটি বিভাগ থাকবে, যে বিভাগের মাধ্যমে সরকারি সকল নিয়োগ দিবে ও বেসরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদন দিবে।

৪২। উন্নয়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করার জন্য সাবেক বৃহত্তম ১৭ জেলাকে আলাদা প্রাদেশিক মর্যাদা দিয়ে পর্যায়ক্রমে শাসন ব্যবস্থা চালু করা হবে । যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা ও সংসদ ব্যবস্থা থাকবে। 

৪৩। দেশের প্রয়োজনে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হবে তবে রপ্তানি করা হবেনা।

৪৪। ধর্মীয় অনুষ্ঠার যার যার জাতীয় ও সংস্কৃতির অনুষ্ঠান সবার এই স্লোগানে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক শক্তি মুক্ত সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বন্ধনের মিলন গঠানো হবে।

৪৫। অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য আমদানিতে শুল্কহার কমানো হবে এবং উৎপাদনে ভর্তুকি দেওয়া হবে।

৪৬।  কৃষি প্রযুক্তির  মালামাল উৎপাদনের উপাদানের উপর আমদানি শুল্কমুক্ত আরো কমানো হবে।

৪৭। শব্দ, পরিবেশ ও বায়ুদূষণ বিরোধী কার্যকর আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করা হবে এবং প্রত্যেক জেলায় শহরের বাহিরে আলাদা শিল্প নগরী স্থাপন করা হবে।

৪৮। অপ্রয়োজনীয় বিদেশি মিডিয়া বন্ধ করে দেশের মিডিয়ার প্রচার ও প্রসার করা হবে এবং প্রতিটি চ্যানেলকে একটি নিদিষ্ট বিষয় বিশেষ মাধ্যম হিসেবে প্রচারের অনুমতি প্রদান করা হবে।

৪৯। ক্রীড়াঙ্গনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা হবে এবং খেলোয়ারদের জন্য কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করা হবে।

৫০। প্রবাসীদের আয় ও বিনিয়োগের উপর করের হার কমানো হবে বা প্রয়োজনে তোলে নেওয়া হবে এবং
প্রবাসী ও তার পরিবার সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ আইন করা হবে।

৫১। প্রবাসী নাগরিক সুরক্ষা আইন করে বিদেশে বাংলাদেশী প্রবাসী নাগরিকদেরকে আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে এবং প্রবাসীদের স্ত্রী ও সন্তানকে দেশে বিশেষ আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।

৫২। লেবার ভিসায় শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার জন্য বিনা সুদে মেয়াদী  ঋণ দেওয়া হবে। এবং মেয়াদের মধ্যে বিদেশে শ্রমিকের মৃত্যু হলে ঋণ মকুফ করা হবে এবং লাশ দেশে আনার বিমান খরচ সরকার বহন করবে।

৫৩। প্রতিটি জেলা রেলপথ এর আওতাধীন ও প্রতিটি বিভাগে বা প্রদেশে বিমান বন্দর নির্মাণ করা হবে।

৫৪। শতভাগ বিদুৎতায়ন ও লাইন গুলোকে ভূগর্ভে নিয়ে দুর্ঘটনারোধ করে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া হবে।

৫৫। তামাক পণ্য উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হবে  এবং মাদক ও তামাক বিরোধী প্রচার বাড়ানো হবে। মেগা পরিকল্পনায় তামাক ও মাদক মুক্ত দেশ গড়া হবে।

৫৬। পারমাণবিক শক্তিকে মানবতার কল্যাণের জন্য ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে এবং বিদুৎ শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে, দেশের জনগন প্রয়োজন মনে করলে, দেশ রক্ষায় পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার করা হবে।

৫৭। প্রতিবেশী সকল রাষ্ট্রের সাথে অধিক সুসম্পর্ক স্থাপন করা হবে, আমদানি ও রপ্তানিতে ভারসাম্য আনা হবে এবং বিদেশি মুদ্রা ও সোনার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা হবে।

৫৮। সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি, সীমান্তে হত্যা ও চোরাচালান বন্ধ এবং বিজিবিকে অধিক শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করা হবে।

৫৯। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চতুর্মুখী ভাবে আধুনিকায়ন করা হবে এবং চক্রাকার সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। দেশে গাড়ি উৎপাদন শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হবে।

৬০। দল যার যার, দেশ, মাতৃভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন সবার, এই মন্ত্রে জাতীকে ঐক্যবদ্ধ করা হবে।

৬১। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থি দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রাষ্ট্রীয় গুম-খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা হবে।

৬২। চোরাচালান, মাদকপাচার, নারী ও শিশু পাচার এবং অর্থ পাচার বন্ধ করা হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

৬৩। উন্নয়ন বন্টনের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সমতার সমন্বয় করা হবে এবং আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করা হবে।

৬৪। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি হবে পুজিবাদ, সমাজতত্ত্ব ও ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার কল্যাণময় কাঠামোর সমন্বিত  সংযোজনের এমন একটি রুপ, যেখানে ইনসাপ ও সাম্যের সাথে মৌলিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই অর্থ ব্যবস্থার নাম হলো- "মিক্স আইডিয়াল ইকোনোমি"

৬৫। বিনোদনের জন্য প্রতিটি জেলায় আধুনিক পার্ক ও চিড়াখানা গড়ে তোলা হবে।

৬৬। ঔষধ শিল্পে মান নিশ্চিত করা হবে এবং প্রধান রপ্তানিকৃত শিল্পে পরিণত করা হবে।

৬৭। পোষাক শিল্পের মাধ্যমে বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করা হবে।

৬৮। শ্রমিকদের কর্মবীমা ও চিকিৎসা বীমা চালু করা হবে এবং শ্রমিক নিরাপত্তা আইন করা হবে।

৬৯। (নারী-পুরুষ) ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য সমন্বয় করা হবে এবং নারী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে আইন বাস্তবায়ন করা হবে এবং পুরুষ নির্যাতন বন্ধে আইন প্রণয়ন করা হবে।

৭০। সংবিধান পরিপন্থী সকল রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে।

৭১। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে  ন্যায় ও কল্যাণের শাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ ও আনন্দময় জীবনের জন্য নিরাপদ দেশ গঠন এবং  বর্তমান আধুনিক বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে সর্বাধুনিক কল্যাণকর ও সুন্দর দেশে হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য-

লেখকঃ
মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া

আহবায়ক
লেবার পার্টির নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি ও
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ লেবার পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি।

Monday, October 8, 2018

বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও গণতন্ত্রকে হত্যাঃ মহসীন ভূঁইয়া

বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও গণতন্ত্রকে হত্যাঃ

বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি'র) চেয়ারপার্সন, ২০ দলীয় ঐক্য জোটের প্রধান নেতা ও এদেশের গণতন্ত্রের"মা" বেগম খালেদা জিয়া প্রায় তিন মাস হলো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আছেন। তাকে বর্তমান অনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় সাজানো রায় দিয়ে প্রতিহিংসা বসত বন্ধি করে রেখেছেন। দেশের ষোলো কোটি জনগন যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশায় বেগম জিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে, ঠিক তখনই সরকার নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে আবারো পাকাপোক্ত করার নেশায় বিএনপি সহ ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের উপর মামলা-হামলা, গুম- খুন ও হত্যা- নির্যাতন করে ক্ষান্ত না হয়ে, আজ বেগম জিয়াকে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকার ক্ষমতা হারানো ভয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা (তত্তাবধায়ক সরকার) টাকে  বাতিল করে এদেশের জনগনের সাথে প্রতারণা করেছে। এখন আবার নতুন করে নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে তৈরির ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে কর্মকান্ড দেখে মনে হয়,  তারা সরকারে আমলা নয়, আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী। তারা জনগণের বা দেশের চেয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য দেখাতে বেশি ব্যস্ত। সরকারের সাথে আঁতাত করে তারাও বেগম জিয়াকে নির্বাচনের বাহিরে রাখতে চায়। ৫ই জানুয়ারীর মত আবারও নির্বাচনের নামে তামাশা করে বিএনপি জোটকে নির্বাচনের বাহিরে রেখে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চায়। তাদের চিন্তা চেতনা এখন বাকশাল আর স্বৈরাচারী ভাব ফুটে উঠেছে। অতীতের যেমন জনগনের উপর আস্তা হারিয়ে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিল, এখনও জনগণের উপর আস্তা বিশ্বাস হারিয়ে সেই পথে হাটছে। আগের মত এবারও বাংলার ষোলো কোটি জনগণ আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র  রুখে দিবো, গণতন্ত্রের "মা" বেগম খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার অন্ধকার কারাগার থেকে গণতন্ত্রের নতুন গণআন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করবে। বাকশালী স্বৈরাচারিনীর নির্যাতন থেকে এদেশের জনগণ মুক্তির নতুন সূর্য উদিত করবে। জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা  জিয়া  মুক্ত হবে, তারই নেতৃত্বে  স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক,  গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মুক্তি অর্জিত হবে, ইনশা আল্লাহ।

লেখকঃ
(মুহাঃ মহসীন ভূঁইয়া)
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ লেবার পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি।

Tuesday, October 2, 2018

হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফরায়েজি আন্দোলনঃ মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া

হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফরায়েজি আন্দোলনঃ

হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম হয়েছিল ১৭৮১ সালে বাংলাদেশের মাদারিপুর জেলায় চর শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামের এক দরিদ্র তালুকদার পরিবারে। আর মৃত্যুবরণ করেন ১৮৪০ সালে। তিনি মক্কা শরীফে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে হজ পালনের গমন করেন, এবং মক্কায় প্রায় ২০ বছর অবস্থান করে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে বাংলায় ফিরে আসেন। 
তিনি একজন আরবি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। এছাড়াও ধর্মীয় সংস্কারক, নীলকর ও সামন্তবাদ বিরোধী নেতা এবং ভারতবর্ষে সংঘটিত ফরায়জি আন্দোলন তারই নেতৃত্বে হয়েছিল। তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, ছিলেন কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার প্রধান সংগঠক ও নেতা।

দেশে ফিরে তিনি আরবের ওয়াহাবী আন্দোলনের আদলে ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তার প্রবর্তিত ধর্মমত ছিল আধুনিক ও মানবতাবাদী। মুসলিম ধর্মের উৎপীড়নমূলক নিয়ম রদ করে ভন্ড মোল্লা মৌলবীদের হাত থেকে তার শিষ্যদের রক্ষা করেন। একারনে রক্ষণশীল ধনী মুসলমানেরা তাকে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করে। ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার অসংখ্য কৃষক তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিল। তার ছেলে দুদু মিয়াও একজন ঐতিহাসিক যোদ্ধা এবং ফরায়েজী আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি নীলকরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এদেশ থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানোতে ভূমিকা রেখেছেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ'র নামানুসারে বাংলাদেশের শরিয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে মাদারিপুরের শিবচরে আড়িয়াল নদীর উপরে নির্মিত সেতুটির নাম করণ করা হয়েছে- 
"হাজী শরীয়তুল্লাহ সেতু"

ফরায়েজী আন্দোলন  ঊনিশ শতকে বাংলায় গড়ে ওঠা একটি সংস্কার আন্দোলন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্কার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনে আর্থ-সামাজিক সংস্কারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফরায়েজী শব্দটি ‘ফরজ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কাজেই ফরায়েজী বলতে তাদেরকেই বোঝায় যাদের লক্ষ্য হচ্ছে অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্যসমূহ কার্যকর করা।
এ আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি অবশ্য শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, অবশ্য পালনীয়ই হোক বা ঐচ্ছিকই হোক, কুরআন ও সুন্নার নির্দেশিত সকল ধর্মীয় কর্তব্যই এর অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তউল্লাহ হজ্ব পালনের জন্য মক্কায় যান এবং সেখানে  হানাফি শাস্ত্রজ্ঞ শেখ তাহির সোম্বলের নিকট ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান যে, বাংলার মুসলমানদের একটি অংশ বহুবিধ স্থানীয় লোকাচার ও পর্ব-উৎসব পালনে উৎসাহী হয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রতি চরম উদাসীন হয়ে উঠেছেন। সে কারণেই তিনি ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন এবং কালক্রমে এ আন্দোলন সমগ্র পূর্ববঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

হাজী শরীয়তউল্লাহ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনকে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করতেন। হানাফি আইনের অনুসরণে তিনি মত প্রকাশ করেন যে, বাংলায় বৈধভাবে নিযুক্ত একজন মুসলিম শাসকের অনুপস্থিতি মুসলমানদের জুমআর নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠানের সুযোগ হতে বঞ্চিত করেছে। এ মত ছিল ফরায়েজী আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য যা একে ওই সময়ের অপরাপর পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন থেকে আলাদা করে তুলেছে।

হাজী শরীয়তউল্লাহ মনে করতেন, আজ বাংলার মুসলিম সমাজ নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন ও অসচেতন। মুসলমান কৃষকদের আত্মসচেতন ও উজ্জীবিত করার কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ছিলেন, একজন একনিষ্ঠ ধর্মপ্রচারক ও সহানুভূতিশীল কৃষক দরদী । ফরায়েজী আন্দোলন অসামান্য দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা, ফরিদপুর,বরিশাল,ময়মনসিংহ, কুমিল্লা,চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলাসমূহে এবং আসাম প্রদেশে বিস্তারলাভ করে। যেসব এলাকায় নব্য হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরগণ শক্তিশালী ছিল এবং কৃষকদের উপর অত্যাচার চালাত সেসকল এলাকায় এ আন্দোলন সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

কিন্তু সমকালীন বাঙালি সমাজে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ফরায়েজী আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে পারেনি। ভূস্বামী শ্রেণি এর স্বার্থ রক্ষার্থে ফরায়েজী ও রক্ষণশীল গোঁড়া মুসলমানদের মধ্যে বিরোধে হস্তক্ষেপ করে। ঢাকার জমিদারগণ পুলিশের সহায়তায় রামনগরে অবস্থিত প্রচারকেন্দ্র থেকে শরীয়তউল্লাহকে বহিষ্কার করেন। হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের সঙ্গে অবিরাম সংঘর্ষের ফলে আন্দোলনটি ক্রমান্বয়ে আর্থ-সামাজিক রূপে চুয়ান্ত সফল হয়নি।

উনিশ শতকে মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নব্য জমিদারগণ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন বহু অতিরিক্ত অবৈধ কর কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেয়। এমনকি, তারা মুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে  কালীপুজা, দুর্গাপূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য কর আদায় করত। শরীয়তউল্লাহ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং জমিদারদের এসকল অবৈধ কর প্রদান না করার জন্য তার শিষ্যদের নির্দেশ দেন। জমিদার গণ ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু জবাইয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। গরু কোরবানি করা মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা এবং মুসলমানদের খাদ্য হিসেবে অন্যান্য মাংসের তুলনায় গরুর মাংসের মূল্য কম বিধায় শরীয়তউল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার জন্য মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন।

কলকাতার সংবাদপত্র এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনাকালে ফরায়েজীদের বিদ্রোহী ভাবাপন্ন দল হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচারাভিযান শুরু করে। ১৮৩৭ সালে জমিদারগণ শরীয়তউল্লাহকে তিতুমীর এর ন্যায় একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তারা ফরায়েজীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে এবং এ কাজে তারা ইউরোপীয় নীলকরদের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করে। কিন্তু তাদের অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হওয়ায় কোন অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে পারে নি। অবশ্য ফরিদপুরে শান্তিভঙ্গ ও গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে ১৮৩৯ সালে শরীয়তউল্লাহ একাধিকবার পুলিশি হেফাজতে ছিলেন।

১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র মুহসীন উদ্দীন ওরফে দুদু মিয়াকে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা ঘোষণা করা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রণোদিত একটি জমিদার শ্রেণি গড়ে তোলে। প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে যতটা সম্ভব অর্থ আদায় করা ছাড়া অপর কোন চিন্তাই তাদের ছিল না। তারা বহুসংখ্যক লাঠিয়াল পুষত এবং তাদের সাহায্যে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাত।

এ ব্যবস্থা জমিদারদের বস্ত্তত সামন্তাধিকার প্রদান করে এবং কৃষক শ্রেণিকে প্রায় ভূমিদাসে পরিণত করে। কলকাতার আদালত ছিল দরিদ্র কৃষকদের আওতার বাইরে। জমিদারদের যৌক্তিক পথে আনার জন্য শক্তি প্রয়োগ ছাড়া দুদু মিয়ার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি কানাইপুরের শিকদার পরিবার ও ফরিদপুরের ঘোষদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এরূপ এক সংঘর্ষে মদন ঘোষ নিহত হন। এর ফলে ১১৭ জন ফরায়েজী আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন এবং তাদের মধ্যে ২২ জন দায়রা জজ কর্তৃক ৭ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন। দুদু মিয়া সহ অন্যান্যরা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

দুদু মিয়ার এই প্রাথমিক বিজয় জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাদের কাছে তাঁর সম্মান অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ ঘটনাপ্রবাহ ফরায়েজী আন্দোলনের প্রসারে আরও প্রেরণা যোগায়। এতদিন যেসব মুসলমান আন্দোলন থেকে দূরে ছিল শুধু তারাই যে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তা নয়, জমিদারদের বিরুদ্ধে দুদু মিয়ার সাহায্য লাভের জন্য হিন্দু ও দেশীয় খ্রিস্টানগণও এ আন্দোলনে যোগ দেয়।

জমিদারদের প্ররোচনায় এন্ড্রু ডানলপ্ নামের একজন প্রভাবশালী নীলকর দুদু মিয়ার চরম শক্রতে পরিণত হয়। কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলাল নামের  এক মাড়োয়ারি হিন্দু পাঁচচরে ডানলপের নীলকুঠির গোমস্তা ছিলেন। ১৮৪৬ সালের অক্টোবর মাসে পাঁচচরের হিন্দু বাবুদের সঙ্গে মিলে আনুমানিক সাত-আটশ’ লোক নিয়ে কাঞ্জিলাল বাহাদুরপুরে দুদু মিয়ার বাড়ি আক্রমণ করেন। দুদু মিয়ার অভিযোগ মতে তারা সামনের দরজা ভেঙে ফেলে, চার জন পাহারাদারকে হত্যা করে এবং অন্যান্যদের মারাত্মকভাবে জখম করে নগদ অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ কেড়ে নেয়। ঘটনাটি পুলিশকে জানালে হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে শুধুমাত্র আহত ব্যক্তিদের বিচারার্থে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণ করেন।

ডানলপের গোমস্তা কালীপ্রসাদ কাঞ্জিলালের সঙ্গে এ সংঘর্ষের কারণে দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে দায়রায় সোপর্দ করা হয়। দায়রা আদালত দুদু মিয়া ও তার ৪০ জন অনুসারীকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে। কিন্ত প্রদত্ত গুরুদন্ড এ আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় রায়টি অনুমোদনের জন্য কলকাতায় সদর নিজামত আদালতে প্রেরণ করা হয়। সদর নিজামত আদালত ফরিয়াদির অভিযোগের বর্ণনা অংশত চরম অবাস্তব এবং অংশত একদম অবিশ্বাস্য বলে মনে করে। ফলে তারা সবাই খালাস পেয়ে যান। দুদু মিয়ার অনুসারিগণ একে নিপীড়িত কৃষককুলের জন্য এক মহাবিজয় বলে স্বাগত জানায়।

১৮৬২ সালে দুদু মিয়া মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার নাবালক পুত্র গিয়াসউদ্দীন হায়দার ও আবদুল গফুর ওরফে নয়া মিয়ার তত্ত্বাবধানের জন্য একটি অভিভাবক পরিষদ গঠন করেন। এ দুই পুত্র পরপর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। পরিষদ ক্ষীয়মান আন্দোলনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। নয়া মিয়ার বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে এবং তার নেতৃত্বে আন্দোলন হারানো শক্তি কিছুটা ফিরে পায়। মাদারীপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন বিচক্ষণতার সঙ্গে পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে ফরায়েজী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলেন। ফরায়েজী নেতৃবৃন্দও তাদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করে।

১৮৮৪ সালে নয়া মিয়ার মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার তৃতীয় ও কনিষ্ঠতম পুত্র সৈয়দউদ্দীন আহমদ ফরায়েজীদের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর সময়ে তাইয়ুনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘর্ষ চরমে পৌঁছে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্ক পূর্ববঙ্গে নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। সরকার সৈয়দউদ্দীনকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এর প্রশ্নে তিনি বিভাজনের পক্ষে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। কিন্তু ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

খান বাহাদুর সৈয়দউদ্দীনের পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র রশিদউদ্দীন আহমদ ওরফে বাদশা মিয়া ফরায়েজী নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বের প্রথমদিকে বাদশা মিয়া সরকারের প্রতি সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ তাকে ব্রিটিশ বিরোধী করে তোলে এবং তিনি খেলাফত ও অসহযোগী আন্দোলনে যোগ দেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জে ফরায়েজীদের এক সম্মেলন আহবান করে পাকিস্তানকে ‘দারুল ইসলাম’ বলে ঘোষণা করেন এবং তার অনুসারীদের জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করেন।

ফরায়েজীগণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মানুশীলনে কতিপয় স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যসহ হানাফি মযহাবের অনুসারী ছিল। ঐ বৈশিষ্ট্যগুলিকে মোটামুটি পাঁচটি ফরায়েযী মতবাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়: 
১. তওবা অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে অতীত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
২. ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ কঠোরভাবে পালন করা। ৩. কুরআন নির্দেশিত তৌহিদ বা একেশ্বরবাদ।
৪. ভারতবর্ষ ‘দারুল হরব’ বিধায় এখানে জুমআ ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠান অত্যাবশ্যকীয় নয়।
৫. কুরআন ও সুন্নাহ বহির্ভূত সকল লোকাচার ও অনুষ্ঠানকে ‘বিদাত’ বলে পরিহার করা। 
পীর ও ‘মুরিদ’ অভিধার পরিবর্তে ফরায়েজীদের নেতাকে ‘ওস্তাদ’ বা শিক্ষক এবং তার অনুসারীদের ‘শাগরিদ’ বা শিষ্য বলা। ফরায়েজী জামায়াতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিকে ‘তওবার মুসলিম’ বা ‘মুমিন’ বলা।

ফরায়েজীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে দুদু মিয়ার দুটি লক্ষ্য ছিল: ১. হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচার থেকে ফরায়েজী কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষা করা এবং ২. জনগণের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম লক্ষ্যটি অর্জনের জন্য তিনি এক স্বেচ্ছাসেবক লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি অর্জনের জন্য তিনি ফরায়েজীদের নেতৃত্বে সনাতন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা (পঞ্চায়েত) পুনঃপ্রবর্তন করেন। প্রথমোক্তটি ‘সিয়াসতি’ বা রাজনৈতিক শাখা এবং পরেরটি ‘দ্বীনি’ বা ধর্মীয় শাখা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এ দুটি শাখা একীভূত করে ‘খিলাফত’ ব্যবস্থার রূপ দেওয়া হয়।

ফরায়েজী খিলাফত পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল সকল ফরায়েজীকে দুদু মিয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের (খলিফা) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা। খলিফাদের এই পরম্পরায় সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ‘ওস্তাদ’ দুদু মিয়া। তিনি তিন পদমর্যাদার খলিফা নিয়োগ করেন: উপরস্থ খলিফা, তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও গাঁও খলিফা।

দুদু মিয়া ফরায়েজী বসতি এলাকাকে ৩০০ থেকে ৫০০ পরিবারের এক একটি ছোট এককে বিভক্ত করেন এবং প্রতি এককে একজন গাঁও বা ওয়ার্ড খলিফা নিযুক্ত করেন। অনুরূপ দশ বা তদোধিক একক নিয়ে একটি সার্কেল বা গির্দ গঠিত হতো। প্রতিটি সার্কেল বা গির্দে একজন করে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা নিয়োজিত হতেন। তত্ত্বাবধায়ক খলিফাকে একজন পিয়ন ও একজন পেয়াদা বা পাহারাদার দেওয়া হতো। এই পিয়ন ও পেয়াদারা একদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফার সঙ্গে গাঁও খলিফাদের এবং অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ও ওস্তাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত। ‘উপরস্থ খলিফা’গণ ছিলেন ওস্তাদের উপদেষ্টা এবং তারা ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কার্যালয় বাহাদুরপুরে ওস্তাদের সঙ্গে অবস্থান করতেন।

গাঁও খলিফা একজন সমাজপতির ভূমিকা পালন করতেন যার দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় কর্তব্য পালনে লোককে উদ্বুদ্ধ করা, খানকাহও মসজিদ সংরক্ষণ, নৈতিকতা পর্যবেক্ষণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারকার্য সম্পন্ন করা। কুরআন শিক্ষা এবং ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের লক্ষ্যে একটি মকতব পরিচালনাও তার দায়িত্ব ছিল। তত্ত্বাবধায়ক খলিফার প্রধান দায়িত্ব ছিল গাঁও খলিফাদের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা, তার অধীনস্থ গির্দের ফরায়েজীদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ রাখা, ধর্মের মৌলনীতি প্রচার এবং সর্বোপরি গাঁও খলিফাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোন আপিল মামলার নিষ্পত্তি করা। এরূপ ক্ষেত্রে তিনি তার গির্দের খলিফাদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদে বসে আপিল মামলার শুনানি গ্রহণ করতেন। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সকল বিষয়ে দুদু মিয়ার সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত এবং ওস্তাদ হিসেবে তিনি চূড়ান্ত আপিল আদালত হিসেবে কাজ করতেন।

ফরায়েজী আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক দিক হলো নবসৃষ্ট জমিদারদের নিপীড়ন প্রতিরোধের জন্য জনগণের একটি সুসংগঠিত পদক্ষেপ। এতে জমিদার ও নীলকরদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষক সম্প্রদায়ের অসন্তোষের তীব্রতার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি ছিল জনতার কাতার থেকে এক ধরনের সফল নেতৃত্ব গড়ে উঠার একটি উদাহরণ।

লেখকঃ
মুহাম্মদ মহসীন ভূঁইয়া
বিএসএস (অনার্স) এমএসএস (অর্থনীতি)।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।